বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক জোট গঠনকে ‘নির্বাচনী প্রকৌশল’-এর একটি রূপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের স্টেট সিনেটর শেখ রহমান। তিনি বলেন, জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে জোট গঠন হওয়া উচিত নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে, ভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে।
তিনি বলেন, “কোনো রাজনৈতিক দল যদি সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত আসন না পায়, তাহলে নির্বাচনে বিজয়ী সমমনা প্রার্থীদের সঙ্গে পরবর্তীতে জোট গঠনের কথা ভাবতে পারে।”
শুক্রবার এই প্রতিবেদকের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মতামত জানাতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সিনেটর রহমান সতর্ক করে বলেন, নির্বাচন-পূর্ব জোট গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা ক্ষুণ্ন করে এবং ভোটারদের স্বাধীন পছন্দের অধিকার সীমিত করে।
তিনি নিজ নিজ দল ভেঙে বা ত্যাগ করে অন্য রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে—বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-তে—যোগ দেওয়া রাজনীতিবিদদের প্রতি হতাশা প্রকাশ করেন। তার মতে, এ ধরনের আচরণ আদর্শিক অঙ্গীকারের অভাবের প্রতিফলন। তিনি বলেন, কেবল নির্বাচনী সুবিধার জন্য দল পরিবর্তনকারী রাজনীতিবিদরা নির্বাচিত হলেও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হবেন, কারণ তারা নিজের রাজনৈতিক নীতিই বিসর্জন দিয়েছেন।
সিনেটর রহমান নিজস্ব দলীয় প্রতীক পরিত্যাগ করে ভিন্ন ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদেরও সমালোচনা করেন এবং একে সুযোগসন্ধানী আচরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ভোটারদের উচিত ব্যালটের মাধ্যমে এ ধরনের প্রার্থীদের প্রত্যাখ্যান করা।
সার্বিক নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা নিয়ে তার খুব কম আস্থা রয়েছে, কারণ নির্বাচনের আগে কোনো অর্থবহ প্রাতিষ্ঠানিক বা নির্বাচন সংস্কার করা হয়নি। সংস্কার ছাড়া নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বলই থেকে যায় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাইয়ে বাতিলের বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন প্রসঙ্গে তিনি পরিস্থিতিকে ‘দ্বৈত মানদণ্ড’-এর প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, নির্বাচন কর্তৃপক্ষ আদৌ কি নিয়ম ও প্রক্রিয়া সবার ক্ষেত্রে সমভাবে প্রয়োগ করছে এবং তাদের নিরপেক্ষতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে আমলাদের দুর্নীতি এখনো গভীরভাবে প্রোথিত এবং বিচার বিভাগ গুরুতর বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে ভুগছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমলাদের রাজনৈতিক নেতাদের অনুগ্রহ কামনা না করে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করা উচিত।
নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “মনোনয়ন থেকে শুরু করে প্রার্থিতা যাচাই—নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমি যা দেখছি ও শুনছি, তাতে আমি সন্তুষ্ট নই।”
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মুখোমুখি হওয়া চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে তিনি নিবন্ধিত ভোটারের এক শতাংশ স্বাক্ষর সংগ্রহের শর্তকে অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই শর্ত পূরণ করার পরও অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ে বাতিল হচ্ছেন, যা কার্যত তাদের নির্বাচন থেকে বাদ দিচ্ছে।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে কী ঘটছে, আমরা তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।” বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে যথাযথ পর্যায়ে প্রশ্ন তোলা হতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ডানপন্থী দলের নির্বাচনী সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সিনেটর রহমান বলেন, ফলাফল পুরোপুরি ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করা উচিত। তিনি বলেন, “মানুষ যদি তাদের ভোট দেয়, তারা জিততে পারে এবং এমনকি সরকারও গঠন করতে পারে। সিদ্ধান্ত নেবে জনগণ, দলীয় নেতারা নয়।”
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশপ্রেম কথার মাধ্যমে নয়, কাজে প্রমাণ করতে হয়। তিনি ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের পরিবর্তে সৎ, শিক্ষিত ও চরিত্রবান প্রার্থীদের নির্বাচিত করেন। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় বসবাসকারী প্রার্থীদের বেছে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
সিনেটর শেখ রহমান জুলাই আন্দোলনে স্বৈরাচারমুক্তির দাবিতে প্রাণ উৎসর্গকারী তরুণদের স্মরণ করেন এবং বলেন, তাদের চেতনা ধারণ করতে ব্যর্থ হলে জাতি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হারাতে পারে। তিনি বলেন, “দেশ যদি প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তা হবে দুঃখজনক।” তিনি যোগ করেন, তিনি চান বাংলাদেশ সফল হোক।
গণপিটুনি ও সহিংসতা প্রসঙ্গে তিনি নাগরিকদের সহিংসতা ও সরকারি সম্পদ ধ্বংস থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান এবং জাতীয় ঐক্য ও অগ্রগতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দেন।
অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পক্ষে মত দিয়ে তিনি বলেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেত। ভোটাররা যদি দলটিকে প্রত্যাখ্যান করতেন, তাহলে তারা ভোটেই পরাজিত হতো। তিনি বলেন, “জনগণকেই তাদের প্রতিনিধি বেছে নিতে দিন।”
তিনি আরও বলেন, বড় রাজনৈতিক দলের কিছু প্রার্থী দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত বা অসম্পূর্ণ কাগজপত্র জমা দিয়েও নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন, অথচ স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রায়ই নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
উল্লেখ্য ,আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ডেস্ক রিপোর্ট