তাজমহল বিতর্ক: হিন্দুত্ববাদী আখ্যানের উত্থানে ইতিহাস ও রাজনীতির লড়াই
- আপলোড সময় : ৩১-১০-২০২৫ ০১:১৩:২৯ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ৩১-১০-২০২৫ ০১:১৩:২৯ পূর্বাহ্ন
- ২ মিনিট পড়ার সময়
- ৫৬ বার পঠিত
ভারতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতিহাস ঘিরে বিভাজনমূলক নানা বয়ান জোরালো হয়েছে, যেখানে মুসলমানদের প্রতি বৈষম্য নতুন মাত্রা পেয়েছে। দক্ষিণপন্থি গোষ্ঠীগুলোর প্রচারে এমন মত গঠিত হচ্ছে যে, ভারতের স্থাপত্য ও ইতিহাসে মুসলিম শাসকরা নাকি দেশীয় ঐতিহ্য দখল করেছিল। সেই বিতর্কের সাম্প্রতিক উদাহরণ ‘দ্য তাজ স্টোরি’ নামের আসন্ন হিন্দি চলচ্চিত্র, যেখানে দাবি করা হয়েছে—বিশ্বখ্যাত তাজমহল আসলে ‘তেজো মহালয়া’ নামের একটি হিন্দু মন্দির ছিল।
তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড-এর এক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে গবেষক সাইদ উনস উল্লেখ করেছেন, ইতিহাস বিকৃতির এই প্রবণতা কেবল বিনোদন পণ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং রাষ্ট্রীয় বয়ানের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও সামাজিক মাধ্যম এক ধরনের বিকল্প শিক্ষক হয়ে উঠেছে—যেখানে আবেগ সত্যের স্থানে বসে পড়েছে।
‘দ্য তাজ স্টোরি’-র দাবি নতুন নয়। এ ধরনের তত্ত্ব প্রায় প্রতি কয়েক বছর পর পর নতুন রূপে ফিরে আসে, যেখানে দেশপ্রেম আর পৌরাণিক বিশ্বাস জুড়ে দেওয়া হয় ইতিহাসের গায়ে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই ‘ছদ্ম ইতিহাস’ আরও গতি পেয়েছে। দেশজুড়ে পাঠ্যপুস্তক থেকে মুঘল অধ্যায় বাদ দেওয়া, ইসলামি নামধারী শহরের নাম পরিবর্তন এবং মুসলিম অবদান নিয়ে প্রকাশ্য প্রশ্ন তোলা—সবই তারই ধারাবাহিকতা।
তবে ফার্সি, সংস্কৃত বা ঔপনিবেশিক আমলের কোনো উৎসেই ‘তেজো মহালয়া’ নামে মন্দিরের ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। এই ধারণা প্রকাশ করেন স্বঘোষিত সংশোধনবাদী লেখক পুরুষোত্তম নাগেশ ওক। তাঁর ১৯৮০-এর দশকে প্রকাশিত বইয়ে তিনি কোন দৃঢ় প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেন যে শাহজাহান তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন একটি শিবমন্দির দখল করে। ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং একে ‘ভিত্তিহীন কল্পনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তবুও এই তত্ত্ব টিকে আছে কারণ এটি দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক প্রবণতাকে শক্তি জোগায়। এটি এমন একটি আখ্যান তৈরি করে যেখানে মুসলিম শাসকদের ‘আক্রমণকারী’ হিসেবে এবং হিন্দু ঐতিহ্যকে ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে তাজমহল হয়ে উঠেছে ইতিহাস পুনর্লিখনের প্রতীক, যেখানে প্রমাণের চেয়ে বিশ্বাসকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তেজো মহালয়া তত্ত্বের পক্ষে একাধিক আদালতে আবেদন দাখিল হলেও প্রতিটিই খারিজ হয়েছে। তারপরও প্রত্যেক নতুন প্রচার প্রচলিত মিথকে পুনরুজ্জীবিত করে। ইতিহাসের এমন বিকৃতি বৃহত্তর এক প্রবণতার অংশ, যেখানে ইসলামি নিদর্শনকে ‘বিদেশি’ আর হিন্দু প্রতীককে ‘জাতীয়’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ভারতের বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠী ক্রমশ ‘অন্য’ করে তোলা হচ্ছে—যা রাজনৈতিকভাবে তাৎক্ষণিক ফল দেয়।
সুতরাং, তাজমহল বিতর্ক শুধু একটি স্থাপত্যের প্রশ্ন নয়; এটি সত্য বনাম বিশ্বাস, ইতিহাস বনাম মতাদর্শ এবং অন্তর্ভুক্তি বনাম বিভাজনের এক প্রতীকী লড়াই।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।