ইসরায়েলি সেনাকে জুতার বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করায় অ্যাডিডাস বয়কটের ডাক
গাজায় চলমান সংঘাতের মধ্যে এক পায়ে চলা সাবেক ইসরায়েলি সেনাকে ‘সিঙ্গেল-শু-সার্ভিস’ নামক জুতাসংক্রান্ত প্রচারণায় মুখ হিসেবে ব্যবহার করায় ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাসের বিরুদ্ধে বয়কটের ডাক দিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা।
নিউজটি শুনুন
- আপলোড সময় : ০৮-০৯-২০২৬ ০১:৪৫:৪৩ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৮-০৯-২০২৬ ০১:৪৫:৪৩ অপরাহ্ন
- ৩ মিনিট পড়ার সময়
- ৭১ বার পঠিত
ছবি: সংগৃহীত
গাজায় ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের মধ্যে সাবেক এক ইসরায়েলি সেনাকে ব্যবহার করে জুতাসংক্রান্ত বিজ্ঞাপন করার অভিযোগ উঠেছে ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাসের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বয়কটের ডাক দিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের অনেকে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : স্টাফ রিপোর্টার, ডেস্ক-০২
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সাবেক ইসরায়েলি সেনা শালেভ বিটন। অ্যাডিডাসের ‘সিঙ্গেল-শু-সার্ভিস’ নামের একটি প্রচারণায় তাকে ব্যবহার করা হয়েছে। এই সেবার আওতায় বিভিন্ন কারণে একটি পা হারানো ব্যক্তিরা জোড়ার পরিবর্তে একটি জুতা কেনার সুযোগ পান। তবে গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সাবেক ইসরায়েলি সেনাকে এই প্রচারণার মুখ হিসেবে বেছে নেওয়ায় সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, গাজায় যখন হাজারো মানুষ সংঘাতের কারণে অঙ্গহানি ও গুরুতর আহত হওয়ার শিকার হয়েছেন, তখন প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য একটি সুবিধামূলক উদ্যোগের প্রচারণায় কেন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একজন সাবেক সদস্যকে বেছে নেওয়া হলো।
বিটন ২০২১ সালের, মে মাসে, গাজার কাছে সংঘর্ষে আহত হয়ে তার বাম পা হারান। অ্যাডিডাসের প্রচারণায় তার অন্তর্ভুক্তি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, বিশেষকরে, গাজায় ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রতিবন্ধিতা ও অঙ্গহানির বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে দেখছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ৫ হাজারের বেশি মানুষ সংঘাতজনিত কারণে হাত-পা হারিয়েছেন। একই সময়ে ২২ হাজারের বেশি মানুষ গুরুতর অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন।
শুধু প্রাপ্তবয়স্করাই নন, এই সংঘাতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিশুরাও। ইউনিসেফের সর্বশেষ ‘স্টেট অব প্যালেস্টাইন’ আপিল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১১ হাজারের বেশি শিশু এমন গুরুতর আঘাত পেয়েছে, যা তাদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন এনেছে।
এর আগেও গাজায় শিশুদের অঙ্গহানির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছিল বিভিন্ন প্রতিবেদনে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সিএনএন, সেভ দ্য চিলড্রেন ও ইউনিসেফের তথ্যের বরাত দিয়ে জানায়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় প্রতিদিন গড়ে ১০টির বেশি শিশু একটি বা দুটি পা হারিয়েছে। ওই সময়ের হিসাবে, ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় এক হাজার শিশু একটি বা দুটি পা হারিয়েছিল।
ডব্লিউএইচও আরও জানিয়েছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত, গাজায় ২ হাজার ২৭৭ জন অঙ্গহানি হওয়া ব্যক্তির মূল্যায়ন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মাত্র ৫০২ জন কৃত্রিম অঙ্গ পেয়েছেন। সংস্থাটির মতে, গাজায় পুনর্বাসনসেবা ও সহায়ক চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।
এছাড়া ডব্লিউএইচওর পৃথক এক হিসাব অনুযায়ী, গাজায় ৪২ হাজারের বেশি মানুষ এমন ধরনের আঘাত পেয়েছেন, যার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন চিকিৎসার প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতিতে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, অঙ্গহানি হওয়া ফিলিস্তিনিরা প্রতিবন্ধী মানুষের সুযোগ-সুবিধা ও প্রবেশগম্যতা নিয়ে আলোচনায় একই ধরনের গুরুত্ব পাচ্ছেন কি না। তবে সমালোচনার বড় অংশ অ্যাডিডাসের ‘সিঙ্গেল-শু-সার্ভিস’কে ঘিরে নয়; বরং প্রচারণার জন্য বিটনকে বেছে নেওয়া এবং এর পেছনে থাকা যুদ্ধের রাজনৈতিক ও মানবিক প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করেই আপত্তি উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। ব্যবহারকারীদের অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীতে কাজ করার অতীত থাকা একজন ব্যক্তিকে গাজা যুদ্ধের এমন এক সময়ে অ্যাডিডাস কেন প্রচারণার প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিল।
এদিকে, অ্যাডিডাসের এই সিদ্ধান্তের পর প্রতিষ্ঠানটির পণ্য বয়কটের আহ্বান জানিয়েছেন স্প্যানিশ অভিনেতা হাভিয়ের বারদেম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্টোরি পোস্টে অনুসারীদের অ্যাডিডাস বয়কটের আহ্বান জানান তিনি। বিটনকে সামনে রেখে ইসরায়েলে ‘সিঙ্গেল-শু-সার্ভিস’ প্রচারের সিদ্ধান্তের পরই তার এই প্রতিক্রিয়া আসে।
অ্যাডিডাস ইউরোপে ‘সিঙ্গেল-শু-সার্ভিস’ চালু করে ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি। পরে মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্যোগটির ঘোষণা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। অ্যাডিডাসের মালিকানাধীন স্টোরের মাধ্যমে ইউরোপের ২৩টি দেশে এই সেবা চালু করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং এর ফলে হাজারো মানুষের অঙ্গহানির প্রেক্ষাপটে প্রচারণাটিতে সাবেক ইসরায়েলি সেনার উপস্থিতি নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, প্রতিবন্ধী ও অঙ্গহানি হওয়া মানুষের জন্য এমন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এর প্রচারণার মুখ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বর্তমান মানবিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।