ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র আমূল বদলে দিচ্ছে; তুলনামূলক কম খরচ, কম ঝুঁকি এবং নির্ভুল আঘাতের ক্ষমতার কারণে এগুলো এখন দুর্বল পক্ষকেও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুযোগ দিচ্ছে। মানুষের উপস্থিতি কমিয়ে, স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম আর এআই–চালিত টার্গেট সিলেকশন বর্তমান বৈশ্বিক সংঘাতে ড্রোনকে এক ধরনের ‘অসম শক্তি’তে পরিণত করেছে, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত কামান ও ভারী অস্ত্রের বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ড্রোনের কৌশলগত গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে এক মোড় ঘোরানো উদাহরণ। ২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর সংখ্যায় ও অস্ত্রে দুর্বল কিয়েভ ড্রোন-নির্ভর কৌশল ছাড়া এত দীর্ঘ সময় যুদ্ধ টিকিয়ে রাখতে পারত না বলে সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। তুরস্ক তৈরি বায়রাক্টারসহ বিভিন্ন ধরনের ড্রোন দিয়ে ইউক্রেন রাশিয়ার অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করেছে, পরে নিজেদেরই বৃহৎ ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলে এখন বিশ্বে অন্যতম শীর্ষ ড্রোন উদ্ভাবক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গবেষকদের হিসাবে, দেশটি গত বছর কয়েক মিলিয়ন বাণিজ্যিক ও সামরিক ড্রোন তৈরি করেছে এবং সামনের বছর এই সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়তে পারে।
ইউক্রেনের ড্রোন ব্যবহারে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তিতে। রাশিয়া যখন রেডিও-নিয়ন্ত্রিত ড্রোনের সংকেত জ্যাম করতে সক্ষম হয়, তখন ইউক্রেন ফাইবার-অপটিক কেবল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ড্রোন উদ্ভাবন করে, যা ঘুড়ির মতো কেবল সংযুক্ত থাকলেও প্রায় ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত কার্যক্রম চালাতে পারে। এতে শত্রুর ইলেকট্রনিক জ্যামিং অনেকাংশে অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং সম্মুখসারির যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের টিকে থাকার হার বেড়ে যায়।
ড্রোনের বিস্তার শুধু ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; আফ্রিকা মহাদেশেও এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ দেশ গত দুই দশকে ড্রোন সংগ্রহ করেছে এবং এর বেশিরভাগই তুরস্ক ও চীনের মতো দেশ থেকে আমদানি করা। একই সঙ্গে অন্তত কয়েকটি আফ্রিকান দেশ এখন নিজস্ব ড্রোন তৈরি করছে এবং সেখানে শুধু সরকার নয়, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও রাষ্ট্রবহির্ভূত পক্ষও সামরিক ড্রোন ব্যবহার করছে; সুদানের সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার ঘটনাও এই প্রবণতার ঝুঁকি তুলে ধরেছে।
এআই–চালিত ড্রোন প্রযুক্তি এ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কিছু সিস্টেম এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্য শনাক্ত ও ট্র্যাক করতে পারে এবং শত্রু জ্যামিং এড়িয়ে নির্দিষ্ট সময়ে আঘাত হানতে সক্ষম। অটারিয়নসহ আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো বিদ্যমান ড্রোনকে ‘স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থা’তে রূপান্তর করার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যেখানে মানুষ শুধু লক্ষ্য এলাকার কাছাকাছি পর্যন্ত ড্রোন পরিচালনা করে, এরপর ড্রোনই নিজস্ব অ্যালগরিদমের ভিত্তিতে টার্মিনাল আক্রমণ সম্পন্ন করে। তবে এসব কোম্পানির দাবি, চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্বাচন এখনও মানুষের সিদ্ধান্তেই নির্ভরশীল, অর্থাৎ ‘রোবট নিজে নিজে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে’—এ ধারণা বাস্তবতার তুলনায় অতিরঞ্জিত।
খরচ ও কার্যকারিতার তুলনায় ড্রোন প্রচলিত কামান ও আর্টিলারিকে চ্যালেঞ্জ করছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, একটি আর্টিলারি শেলের দাম যেখানে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে, সেখানে আক্রমণ-উপযোগী ছোট ড্রোন প্রায় ১৫০০ ডলার বা তারও কম খরচে প্রস্তুত করা সম্ভব, তবু অনেক ক্ষেত্রে একটি ড্রোনের আঘাত একাধিক কামানের গোলার সমতুল্য বা তারও বেশি নির্ভুল। ফলে সীমিত বাজেটের দেশ বা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর জন্যও এখন উচ্চ নির্ভুলতাসম্পন্ন আঘাত হানা সহজ হচ্ছে, যা ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন ধরনের অসমতা তৈরি করছে।
সামুদ্রিক ও নৌক্ষেত্রেও ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ দূরনিয়ন্ত্রিত নৌড্রোন (USV) পরীক্ষামূলকভাবে মোতায়েন করছে, যার লক্ষ্য—একটি বড় ডেস্ট্রয়ারের সমপর্যায়ের কিছু মিশন অনেক কম খরচে সম্পন্ন করা। তবে নৌ-অভিযানে ড্রোনের কার্যকারিতা প্রমাণিত হলেও, স্থলভাগে শক্তিশালী দুর্গ বা মজবুত প্রতিরক্ষা ভাঙতে প্রচলিত কামান ও ভারী আর্টিলারি এখনই পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে না বলেই সামরিক কর্মকর্তারা মনে করেন।
তরফে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ড্রোন ও এআই যুদ্ধকে দীর্ঘমেয়াদি এবং অনির্ণেয় করে তুলছে। গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড পিস–এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংঘাতকে আরও সহজলভ্য ও অসম করে তুলছে, যা ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’–ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করছে—যেখানে এক পক্ষ সম্পূর্ণ বিজয় অর্জন করতে পারে না, আবার সম্পূর্ণ পরাজিতও হয় না, কিন্তু বছর ধরে সম্পদ ও মানবিক মূল্য দিতে থাকে। ফলে শান্তির পথে কূটনৈতিক সমাধান আরও জটিল হয়ে উঠে এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে আসা অনেক দেশের জন্যও এটি পরোক্ষ নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে।
ডেস্ক রিপোর্ট