মওলানা ভাসানীর সন্তোষের মুসাফিরখানা: আট দশক ধরে নিঃস্বার্থ সেবার অনন্য দৃষ্টান্ত
টাঙ্গাইলের ঐতিহাসিক এই মুসাফিরখানায় বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন দূরদূরান্ত থেকে আসা হাজারো মানুষ
- আপলোড সময় : ২২-১০-২০২৬ ০৮:০৬:২৩ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২২-১০-২০২৬ ০৮:০৬:২৩ অপরাহ্ন
- ৩ মিনিট পড়ার সময়
- ২৮ বার পঠিত
ছবি: সংগৃহীত
পকেটে টাকা নেই, মাথার ওপর ছাদ নেই, তবুও এক বেলা খাবার কিংবা নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয় না দূরদূরান্ত থেকে আসা পথচারী, অসচ্ছল মানুষ ও ভক্ত-অনুসারীদের। প্রায় আট দশক ধরে তাঁদের বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে আসছে টাঙ্গাইলের সন্তোষের ঐতিহাসিক মুসাফিরখানা। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জনকল্যাণমুখী দর্শনের জীবন্ত স্মারক হিসেবে টিকে আছে এই প্রতিষ্ঠান।
জানা যায়, ১৯৪৬ সালে মওলানা ভাসানী নিজ হাতে এই সেবাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি কৃষক, শ্রমিক ও নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে আপসহীন সংগ্রাম করেছেন। সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর সেই মমত্ববোধ ও দর্শনের প্রতিফলন আজও রয়েছে সন্তোষের এই মুসাফিরখানায়। বর্তমানের ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও জটিল আর্থসামাজিক বাস্তবতায় নিঃস্বার্থ সহমর্মিতা যেখানে ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠছে, সেখানে আট দশক ধরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালু থাকা বিরল দৃষ্টান্ত। এটি শুধু একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং সমতা, ভ্রাতৃত্ব ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় মওলানা ভাসানীর ভাবনার জীবন্ত দলিল।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এই মুসাফিরখানার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে বিদেশেও। এর টানে প্রতিবেশী দেশ থেকে আসছেন মানুষ। সম্প্রতি ভারতের আসামের লক্ষ্মীপুরের গোয়ালপাড়া থেকে সন্তোষে আসেন তিন ব্যবসায়ী। তাঁদের একজন মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা ভাসানী হুজুরের অনুসারী ছিলেন। তাঁদের কাছে হুজুরের অনেক গল্প শুনেছি। আজ সশরীরে সন্তোষে এসে মুসাফিরখানায় যে আতিথেয়তা ও সেবা পেলাম, তা এককথায় চমৎকার। টাঙ্গাইলে এসে আমাদের দারুণ লাগছে।’
আরেক ব্যবসায়ী সানিদুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে এসেই প্রথমে হুজুরের মাজার জিয়ারত করেছি। বাবা-মায়ের কাছে ভাসানীর গৌরবময় ইতিহাস শুনে বড় হয়েছি। আগে শুনতাম, তাঁর প্রতিষ্ঠিত মুসাফিরখানায় থাকা-খাওয়া সম্পূর্ণ ফ্রি। এখানে এসে সেই কথার বাস্তব প্রমাণ পেলাম।’
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান শামসুল, আরেফিন, নওশাদ, খালেক, আসলাম, জাহাঙ্গীর, ছিফাত, লস্কর, তামজিদুল, হরিপদ, রাখাল, সুশান্ত, আজগর, নেহাল, পারভেজ ও শাকুরসহ অনেকে।
মুসাফিরখানায় আগতদের যত্ন নিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ভক্ত-অনুসারীদের খাবারের ব্যবস্থা দেখভাল করেন আমেনা বেগম। তিনি জানান, দর্শনার্থীরা এখানে এসে মওলানা ভাসানীর মাজারসহ বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করেন। কেউ কেউ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বাজার করে নিয়ে আসেন, আবার অনেকে আসেন খালি হাতে। তবে আগন্তুকদের আর্থিক অবস্থা বা পরিচয় যা-ই হোক না কেন, সবার জন্যই সাধ্যমতো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।
মুসাফিরখানার রান্নাঘরে প্রায় ৬০ বছর ধরে নিরলসভাবে কাজ করছেন চান মিয়া। তিনি জানান, প্রতিদিন নিয়মিত দুই বেলা খাবার পরিবেশনের পাশাপাশি প্রতি বৃহস্পতিবার এবং প্রতি চান্দ্র মাসের ১১ তারিখে বিশেষ তবারক বিতরণ করা হয়। এসব দিনে দূরদূরান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক ভক্তের সমাগম ঘটে। এখানে আসা প্রত্যেকের জন্যই বিনা মূল্যে থাকা ও খাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সময়ের পরিবর্তন ও আর্থসামাজিক নানা পরিবর্তনের মধ্যেও সন্তোষের এই মুসাফিরখানার ঐতিহ্য অটুট রয়েছে। প্রায় ৮০ বছর ধরে এর সেবামূলক কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
মওলানা ভাসানীর দৌহিত্র ও ন্যাপ ভাসানীর সভাপতি হাসরত খান ভাসানী বলেন, ‘১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় ৮০ বছর ধরে এই কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে। মূলত হুজুরের মুরিদান, ভক্ত ও মুসাফিরখানায় আসা সাধারণ মানুষের আন্তরিক সহযোগিতাতেই এই মহতী উদ্যোগ আজও সচল রয়েছে।’
মওলানা ভাসানীর মানবিক দর্শনের কথা স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, ‘মওলানা ভাসানী হুজুর বলতেন- তাঁর দরগায় কেউ এলে তাকে যেন অন্তত একটি রুটি দেওয়া হয়। সেই নির্দেশনানুযায়ী, আজ পর্যন্ত এখান থেকে কেউ ক্ষুধার্ত মুখে ফিরে যাননি। আল্লাহর রহমতে ভবিষ্যতেও এই সেবামূলক কার্যক্রম চলমান থাকবে।’
মুসাফিরখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম শহিদুল ইসলাম বলেন, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর স্মৃতি ও আদর্শ ধারণ করে তাঁর হাতে গড়া সব প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সংগঠনকে নতুন করে উজ্জীবিত করা হবে। বিশেষ করে, ঐতিহাসিক মুসাফিরখানাটির আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে, যাতে দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষ আরও সুচারুভাবে সেবা পেতে পারেন।
উপাচার্য আরও জানান, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গবেষণা ও মেধার ক্ষেত্রে দেশে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবেন এবং শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও দক্ষতা লাভ করবেন। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিশ্বপরিসরে অবদান রাখতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।