বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ আশাবাদী থাকলেও, একই সঙ্গে দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন—ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) সর্বশেষ জাতীয় জরিপে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। নাগরিকদের মতে, উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে ইতিবাচক ধারণা থাকলেও টেকসই অগ্রগতির পথে প্রধান অন্তরায় হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় গেঁথে থাকা দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা।
আইআরআইয়ের সেন্টার ফর ইনসাইটস ইন সার্ভে রিসার্চ চলতি বছরের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের সব বিভাগজুড়ে প্রতিনিধিত্বশীল নমুনার ওপর এ জরিপ চালায়, যা ভোটারবয়সী জনগণের মতামত প্রতিফলিত করে। ‘ন্যাশনাল সার্ভে অব বাংলাদেশ, সেপ্টেম্বর–অক্টোবর ২০২৫’ শিরোনামে প্রকাশিত এ সমীক্ষায় রাজনীতি, অর্থনীতি, গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে জনমত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
জরিপে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, দেশ সামগ্রিকভাবে সঠিক পথে এগোচ্ছে এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি, আইনশৃঙ্খলার তুলনামূলক উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তাকে এ আস্থার ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে যারা দেশের গতিপথ নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন, তারা বিশেষভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় চাপকে প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এনেছেন।
দুর্নীতি প্রসঙ্গে জরিপে অংশ নেওয়া উল্লেখযোগ্য অংশের নাগরিক একে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও ন্যায্যতার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং বিশেষ করে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেই দুর্নীতির শিকার হওয়ার আশঙ্কাকে বেশি বলে উল্লেখ করেছেন। জাতীয় পর্যায়ের সরকারি চুক্তি ও প্রকল্প বণ্টনেও দুর্নীতির প্রভাব রয়েছে বলেও জনগণের একটি অংশের মূল্যায়ন উঠে এসেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরীর মতে, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে স্বাধীন ও নির্বাহী কর্তৃত্বমুক্ত দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন না করলে রাজনৈতিক দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা কঠিন হয়ে পড়বে।
রাজনৈতিক সমর্থন ও দলবদল প্রবণতা নিয়েও জরিপে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত এসেছে; বিশেষ করে ইসলামী রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন বৃদ্ধির আভাস এবং ঐতিহ্যগত বড় দলগুলোর প্রতি অনাস্থার বহুমাত্রিকতা লক্ষ করা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতি ইমেজ, পূর্বের শাসন অভিজ্ঞতা ও নতুন বিকল্পের খোঁজ—এসব কারণেই অনেক ভোটার দল নির্বাচন নিয়ে পুনর্বিবেচনা করছেন এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জোটবিন্যাস চূড়ান্ত সমীক্যানে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
জরিপে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জনগণের আস্থার মাত্রা খুবই উঁচু বলে প্রতীয়মান হয়েছে, যা স্থিতিশীলতা ও সংস্কারমুখী শাসনের প্রতি জনসমর্থনের ইঙ্গিত দেয়। অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী অন্তর্বর্তী সরকারকে বৈধ মনে করছেন এবং বিশ্বাস করেন, নির্ধারিত পথনকশা অনুযায়ী তারা কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে সক্ষম হবে।
গণতন্ত্র ও অধিকার প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য অংশের মানুষ মনে করেন দেশে এখনো গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিদ্যমান এবং স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের কিছুটা সুযোগ আছে, তবে রাজনৈতিক এলিট ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব অনেক বেশি বলে অনেকে মনে করেন। ধর্ম ও জাতীয়তার ভিত্তিতে বৈষম্য, নারীর কর্মসংস্থান ও সমঅধিকার, গণমাধ্যম ও সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থা—এসব ক্ষেত্রেও জনমতের মধ্যে আংশিক আস্থা ও আংশিক উদ্বেগের মিশ্র চিত্র ফুটে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে জরিপে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ মানুষ রাশিয়াকে বাংলাদেশের ওপর সবচেয়ে ইতিবাচক প্রভাবক দেশ হিসেবে দেখেছেন, অপরদিকে ভারতের ভূমিকাকে তুলনামূলকভাবে বেশি নেতিবাচক বলে উল্লেখ করেছেন। সামগ্রিকভাবে জরিপের ফল থেকে স্পষ্ট হয়, জনগণ উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী হলেও তারা সুশাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, ন্যায়সঙ্গত নির্বাচন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হওয়া নিয়ে নিবিড় নজর রাখছেন।
ডেস্ক রিপোর্ট