বিকেল সাড়ে তিনটায় তোবগের আগমন দিয়ে বৈঠক শুরু হয়। এরপর ৩০ মিনিটের একান্ত আলোচনার পর দুই দেশের প্রতিনিধিদল প্রায় এক ঘণ্টা আনুষ্ঠানিক বৈঠকে অংশ নেয়। অধ্যাপক ইউনূস ভুটানকে বাংলাদেশের ‘অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় ভুটান ঢাকার অগ্রাধিকার প্রাপ্ত অংশীদার। তার ভাষায়, ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক যোগসূত্র দুই দেশের ভবিষ্যৎকে একই স্রোতে বেঁধে রেখেছে।
জবাবে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ ও আস্থাভিত্তিক। তিনি বাংলাদেশকে ‘ভুটানের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের উৎস’ হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে মধ্যযুগীয় বাংলার বৌদ্ধ ভিক্ষুরা হিমালয়ে ধর্ম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
দুই নেতা বাণিজ্য সহযোগিতা গভীর করতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর ব্যাপারে একমত হন। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী জানান, থিম্পু দ্রুত এফটিএ স্বাক্ষরের আশা করছে এবং এটি দুই দেশের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য আরও গতিশীল করবে। এর আগে ২০২০ সালে বাংলাদেশ ও ভুটান একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, ভুটানি পণ্য পরিবহনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং কাস্টমসে ভুটানি কনটেইনার দ্রুত ছাড় করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে দুই দেশ একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনেও একমত হয়েছে। বাংলার প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে ইউনূস আশা প্রকাশ করেন—আরও বেশি ভুটানি পর্যটক বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সাইট পরিদর্শনে আগ্রহী হবে।
স্বাস্থ্যসেবা খাতে সহযোগিতা বিস্তারে বাংলাদেশ ও ভুটান দুটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করে—একটি স্বাস্থ্য খাতে, আরেকটি আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ বাণিজ্য বিষয়ে। চুক্তির আওতায় ভুটান বাংলাদেশ থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানি করবে, যা ভুটানের ডিজিটাল সংযোগ শক্তিশালী করবে বলে ঢাকা আশা করছে।
বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস জানান, নীলফামারীতে নির্মিতব্য ১,০০০ শয্যার হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ ভবিষ্যতে ভুটানি নাগরিকদের জন্য চিকিৎসা ও শিক্ষার নতুন সুযোগ তৈরি করবে। এছাড়া ভুটানি শিক্ষার্থীদের জন্য মেডিকেল কলেজে আসন সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বুয়েটে আসন বরাদ্দ দেওয়ার ঘোষণাও দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তোবগে জানান, ‘গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি’ নামে ভুটান একটি নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র নির্মাণ করছে, যেখানে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জে ভুটানি কার্গোর লোড–আনলোড সুবিধার প্রস্তাবও রয়েছে।
জলবিদ্যুৎ বাণিজ্যেও দুই দেশ আগ্রহ প্রকাশ করে। ভুটান থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানি এবং ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। অধ্যাপক ইউনূস পুনরায় উল্লেখ করেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের রূপান্তরমুখী সময়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করায় প্রধান উপদেষ্টা ও সরকারের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। তিনি সফরের শুরুতেই বিমানবন্দরে প্রধান উপদেষ্টার ব্যক্তিগত অভ্যর্থনায় ‘আনন্দিত ও আবেগাপ্লুত’ হওয়ার কথা জানান।
বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীরা উপস্থিত ছিলেন।