ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি শেষ করলেন ট্রাম্প: তেহরান ধ্বংসে ইসরায়েলের ‘টোটাল ওয়ার’ পরিকল্পনা, নেপথ্যে সিআইএ-মোসাদ ব্যর্থতা

আপলোড সময় : ১০-০৭-২০২৬ ০১:৩৪:৪৫ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১০-০৭-২০২৬ ০১:৩৪:৪৫ অপরাহ্ন
রূপক অর্থে বলতে গেলে, আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতি শেষ বলে ঘোষণা করার পর, জেরুজালেমে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ে যেন শ্যাম্পেনের বোতল খোলা হয়েছিল। ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে ইরানের নেতাদের ‘আবর্জনা’, ‘ক্যান্সার’ এবং ‘মিথ্যুক’ বলে অভিহিত করেন—যা নেতানিয়াহু এবং তাঁর সরকারের কাছে ছিল মধুর সঙ্গীতের মতো।

গত ১৭ জুন পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একপক্ষে এবং ইরানের অন্যপক্ষের মধ্যে—গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া—যুদ্ধ বন্ধের জন্য ৬০ দিনের যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, তা আসলে নেতানিয়াহুর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী, মোসাদ, ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) এবং ইসরায়েলি বিমান বাহিনী—সবাই লড়াই চালিয়ে যেতে চেয়েছিল। প্রকাশ্য স্বীকার না করলেও, তারা ভালো করেই জানে যে তারা তাদের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

বাস্তবিকই, ইরানের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু যেভাবে দাবি ও আশা করেছিলেন, সেভাবে দেশটির পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, কট্টরপন্থী শাসনের পতন ঘটানো যায়নি। সিআইএ এবং ট্রাম্প প্রশাসন এই শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কৌশল ব্যর্থ হওয়ার জন্য মোসাদকে দায়ী করেছে। তবে, মোসাদ এবং ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমার আলাপচারিতায় ভিন্ন এক চিত্র উঠে এসেছে। তাঁদের মতে, ইরানি শাসন ব্যবস্থা উৎখাতের পরিকল্পনাটি সিআইএ-র সাথে পূর্ণ সহযোগিতায় তৈরি করা হয়েছিল।

২০২৫ সালের জুনে প্রথম ১২ দিনের যুদ্ধের পরপরই মোসাদ এবং সিআইএ একটি যৌথ গোপন অভিযান শুরু করে। তারা ইরানি ও ইরাকি কুর্দি যোদ্ধাদের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও সজ্জিত করার জন্য ইসরায়েলি ও মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা উপদেষ্টাদের ইরাকি কুর্দিস্তানে পাঠায়। তারা এই যোদ্ধাদের অস্ত্র, যানবাহন, ইউনিফর্ম এবং যোগাযোগ সরঞ্জাম সরবরাহ করে কয়েক হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রস্তুত করে, যার উদ্দেশ্য ছিল ইরানে আক্রমণ করা। ইসরায়েলি এবং মার্কিন বিমান শক্তির সুরক্ষায়, এই কুর্দি বাহিনীর স্থলভাগে ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ হিসেবে কাজ করার কথা ছিল, যাতে তারা অঞ্চল দখল করে তেহরানে একটি নতুন ও তুলনামূলক ব্যবহারিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে পারে।

তবে এই পরিকল্পনা কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি, যদিও যুদ্ধের শুরুতেই ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেই—যিনি ৩৭ বছর ধরে কঠোর হস্তে ইরান শাসন করেছিলেন—নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর ক্ষমতা চলে যায় তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনেইর হাতে, যাকে আরও বেশি কট্টরপন্থী মনে করা হয়। ইসরায়েলি গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, মোজতবা—যার স্বাস্থ্য ইসরায়েলি হামলায় আহত হওয়ার পর গুরুতরভাবে ভেঙে পড়েছে—বর্তমানে রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) সবচেয়ে কট্টরপন্থী দলগুলোর হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছেন।

নেতানিয়াহু নিশ্চিত ছিলেন যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং তাঁর এক ডজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডারকে নির্মূল করার পাশাপাশি কুর্দিদের স্থল অভিযান এবং সিআইএ-মোসাদের গোপন প্রভাব খাটিয়ে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটানো যাবে। কিন্তু বাস্তবে শাসনব্যবস্থা টিকে যায়, রেভল্যুশনারি গার্ডস ক্ষমতার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করে এবং শাসন পরিবর্তনের সেই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য করেন, যা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর হতাশা আরও বাড়িয়ে দেয়, কারণ এর মধ্যে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে, সাম্প্রতিক উত্তেজনা—হরমুজ প্রণালীতে তিনটি ট্যাংকারে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, যার জবাবে দুই দিন ধরে মার্কিন বিমান হামলা এবং বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা হামলা—নেতানিয়াহুর মনে আবারও যুদ্ধ শুরুর আশা জাগিয়ে তুলেছে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের পেছনে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক উভয় কারণই রয়েছে। তিনি আট বছর ধরে চলা তিনটি দীর্ঘস্থায়ী দুর্নীতি মামলার জালে জড়িয়ে আছেন, অন্যদিকে প্রায় চার মাস পর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে তাঁর অবস্থান অনেকটাই নেমে গেছে। নেতানিয়াহু আশা করছেন, একটি নতুন যুদ্ধ তাঁর নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে সাহায্য করবে। তা সত্ত্বেও, ইসরায়েলি গোয়েন্দা মহল এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষকদের ধারণা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট কোনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চান না। তাই ধারণা করা হচ্ছে, পাকিস্তানি ও কাতারি মধ্যস্থতাকারীরা আবারও এগিয়ে আসবেন।

যদি সব হিসাব-নিকাশ উল্টে দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ আবার শুরু হয়, তবে ইসরায়েলের পরিকল্পনা হলো ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র, তেল ও গ্যাস স্থাপনা, পানি সরবরাহ এবং শিল্পক্ষেত্রসহ বেশিরভাগ সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া।

মূল সমস্যা হলো, ইরানে আসলে কে কলকাঠি নাড়ছেন তা এখনও স্পষ্ট নয়। ‘মিডল ইস্ট ফোরাম’-এর একটি চোখ খোলার মতো নিবন্ধে সাঈদ গোলকার এবং কাসরা আরাবি লিখেছেন যে, ইরানের শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীগুলো ক্ষমতার এক মারাত্মক কোন্দলে লিপ্ত, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তাঁরা লিখেছেন, ‘এই লড়াই ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের আদর্শ বা ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে নয়; সব পক্ষই ইসলামপন্থী—কেউ পাগড়ি পরেন, কেউ সামরিক ইউনিফর্ম, আবার কেউ স্যুট। বরং আলী খামেনেইর মৃত্যুর পর তৈরি হওয়া শূন্যতার মাঝে তারা নিজেদের ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এবং তা এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করছে।’

এমন পরিস্থিতিতে আলোচনা চালানো অত্যন্ত কঠিন এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত বিস্ফোরক, যদিও ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশই (ইসরায়েলের মতো নয়) যুদ্ধ নতুন করে শুরু হোক তা চায় না। মোসাদের একজন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জোর দিয়ে বলেছেন, ‘পরিস্থিতি যদি আগের অবস্থানেও ফিরে যায় এবং যুদ্ধবিরতি বজায় থাকে, তবুও হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ ও তেলের প্রবাহ সচল রাখা, এবং ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও পারমাণবিক কর্মসূচি মোকাবিলা করার বিষয়ে একটি যৌক্তিক চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।’

তিনি আরও যোগ করেন, যদি সব হিসাব-নিকাশ উল্টে দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ আবার শুরু হয়, তবে এবার ইসরায়েলের পরিকল্পনা হলো ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র, তেল ও গ্যাস স্থাপনা, পানি সরবরাহ এবং শিল্পক্ষেত্রসহ বেশিরভাগ সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া। সেই সূত্রটির ভাষায়, ‘গত যুদ্ধের মতো নয়, এবার ট্রাম্প যদি আবারও নেতানিয়াহুকে টেনে না ধরেন, তবে আমাদের সামনে এটি করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।

সূত্রঃ দ্য স্পেক্টেটর

সম্পাদকীয় :

লাইসেন্স নং: TRAD/DNCC/013106/2024 বার্তা বিভাগ: [email protected] অফিস: [email protected]

অফিস :

যোগাযোগ: মিরপুর, শেওড়াপাড়া হটলাইন: 09638001009 চাকুরী: [email protected]