সুপার এল নিনোর প্রভাবে দেশজুড়ে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া: ৩ জেলায় বন্যা, ১৫ জেলা তীব্র ঝুঁকিতে ও পাহাড়ধসের আশঙ্কা

আপলোড সময় : ১০-০৭-২০২৬ ০৭:৪১:০৬ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১০-০৭-২০২৬ ০৭:৪১:০৬ পূর্বাহ্ন
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হঠাৎ জেঁকে বসেছে দুর্যোগপূর্ণ বৈরী আবহাওয়া। দেশের অভ্যন্তরে অতিবৃষ্টি এবং ভারতের উজান থেকে পাহাড়ি ঢলের কারণে বন্যার পদধ্বনি শুরু হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশের অনেক অঞ্চলে নদ-নদীসমূহের পানির সমতল বৃদ্ধির দিকেই রয়েছে। গতকাল বিকাল পর্যন্ত ৬টি নদ-নদী ১০টি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বিভিন্ন নদীর পানি বাড়ছে হু হু করে। গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতের মেঘালয়, ত্রিপুরা, আসাম, মিজোরাম প্রদেশেরর একেকটি স্থানভেদে ৭০ থেকে ২৪৫ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ সূত্র জানায়, চলতি জুলাই ও সামনে আগস্ট মাসে বড়সড় বন্যার দুর্যোগের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশের সংলগ্ন উজানে উত্তর-পূর্ব ভারতে বন্যার আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দেশে বন্যার শঙ্কা বৃদ্ধির কারণে চলতি আমন জমির ফসল, শাক-সবজি, ফল-ফসল, ক্ষেত-খামার তথা প্রান্তিক কৃষি-খামার খাত ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিপর্যস্ত হচ্ছে জনজীবন।

অতিবৃষ্টিতে পাহাড়-টিলা ও ভূমিধস হচ্ছে চট্টগ্রাম বিভাগে। অতিবৃষ্টি হলেই ভাঙাচোরা পাহাড়-টিলাগুলো ধসে পড়ে যায়। চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় পাহাড়-টিলার পাদদেশে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে অন্তত ৮ থেকে ১০ লাখ হতদরিদ্র মানুষ। এদেরকে অবৈধ উপায়ে গেঁড়ে বসিয়ে প্রতিনিয়ত কাড়ি কাড়ি ‘ভাড়া’ এবং চাঁদা উসুল করছে রাজনৈতিক মদতপুষ্ট প্রভাবশালী একেকটি সিন্ডিকেট। প্রশাসনকে বশীভূত করে মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছে চক্রগুলো।

আবার, এর বিপরীতে উত্তর-পশ্চিমে বরেন্দ্র জনপদসহ দেশের কোথাও কোথাও এখন পর্যন্ত ভরা আষাঢ়েও হয়নি পর্যাপ্ত বা ‘স্বাভাবিক’ পরিমাণ বৃষ্টিপাত। তবে বরেন্দ্র তথা রাজশাহী বিভাগেও আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রশান্ত মহাসাগরতলের দীর্ঘ উত্তপ্ত ঢেউ থেকে সৃষ্ট সুপার ‘এল নিনো’র প্রভাব শুরু হতে না হতেই আবহাওয়া-জলবায়ু প্রকৃতির শৃঙ্খল এলোমেলো, চরম-ভাবাপন্ন ও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠছে। আকস্মিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক তারই নমুনা মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ। বছরজুড়ে এবং আসছে বছর ২০২৭ সাল অবধি আবহাওয়ায় ‘অনিয়ম ও বিশৃঙ্খল’ মতিগতি বজায় থাকতে পারে।

গত চার-পাঁচ দিনে বৃহত্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পার্বত্যাঞ্চল, ফেনী ও সিলেট বিভাগে টানা অতি বৃষ্টিপাত হয়েছে। সেই সঙ্গে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ইতোমধ্যেই আকস্মিক বন্যা কবলিত হয়েছে ৩টি জেলা কক্সবাজার, বান্দরবান ও হবিগঞ্জ। তাছাড়া আগামী ৭২ ঘণ্টায় আরও ১২টি জেলা বন্যা কবলিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বৃষ্টির বাহক দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু (বর্ষা) সক্রিয় ও জোরালো হয়ে উঠেছে। বজ্রপাত, দমকা থেকে ঝড়ো হাওয়া, ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়-টিলা বা ভূমিধস মিলিয়ে হঠাৎ করেই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া জেঁকে বসেছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পার্বত্যাঞ্চল, ফেনী ও সিলেট তৎসংলগ্ন উজানে উত্তর-পূর্ব ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম, মেঘালয় এবং আসাম রাজ্যেও টানা ভারী বর্ষণ হচ্ছে। আগামী তিন থেকে পাঁচ দিনে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে বাংলাদেশ এবং ভারতের আবহাওয়া বিভাগ পূর্বাভাস দিয়েছে।

এ অবস্থায় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য অববাহিকায় এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিশেষত সিলেট অঞ্চলে নদ-নদীসমূহের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। কোথাও কোথাও নদ-নদীর পানি প্রবাহ অতিক্রম করছে বিপদসীমা। তাছাড়া বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বৃষ্টিবাহী মৌসুমী নিম্নচাপটি ভারতের উড়িষ্যা-ঝাড়খন্ড হয়ে মধ্যপ্রদেশের দিকে কেটে গেলেওÑ এর বর্ধিত প্রভাবে সমুদ্র-উপকূলভাগ উত্তাল এবং ফুঁলে-ফুঁসে উঠেছে। উজানের পানি ভাটির দিকে নামতে সাগরের মোহনায় বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সঙ্কেত দেখানো অব্যাহত রয়েছে।

গতকাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র’র দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানান, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সাঙ্গু নদী বান্দরবান পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই অঞ্চলের মাতামুহুরী নদী লামায় (বান্দরবান) বিপদসীমার ১৮ সে.মি. ওপর দিয়ে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খোয়াই নদীর বাল্লা (হবিগঞ্জ) পয়েন্টে বিপদসীমার ১৬০ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। খোয়াই নদীর উজানে ভারতের খোয়াই স্টেশনে গত ২৪ ঘণ্টায় পানির সমতল ৩৬৩ সে.মি. বৃদ্ধি পেয়েছে।

গতকাল পাউবো পূর্বাভাসে আরো জানায়, ইতোমধ্যে আকস্মিক বন্যা কবলিত হয়েছে কক্সবাজার, বান্দরবান ও হবিগঞ্জ জেলা। আগামী ৭২ ঘণ্টায় এই তিনটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটতে পারে। তাছাড়া টানা অতি বৃষ্টিতে বিভিন্ন নদ-নদী-খালের পানি বৃদ্ধি ও ভারতের উজান থেকে আসা ঢলের কারণে দেশের আরো ১২টি জেলা বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।

জেলাগুলো হচ্ছে ফেনী, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার হবিগঞ্জ, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর এবং কুড়িগ্রাম। দ্রুত পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে সাঙ্গু, মাতামুহুরী, ফেনী, মুহুরী, সিলোনিয়া, হালদা, খোয়াই, মনু, ধলাই, সারিগোয়াইন, জাদুকাটা, সোমেশ^রী, ভুগাই, কংস, উত্তর জনপদে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদ-নদীসমূহের। সেখানকার নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল শিগগিরই প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আবহাওয়া বিভাগ এবং পাউবো সূত্র জানায়, সক্রিয় ও প্রবল মৌসুমী বায়ু এবং মৌসুমী নিম্নচাপের দ্বিমুখী প্রভাবে গত ৩ দিনে (৭২ ঘণ্টায়) চট্টগ্রামে ৬৩১ মিলিমিটার, কক্সবাজারে ৪৪৫ মি.মি., বান্দরবানের লামায় ৫১৬ মি.মি. অস্বাভাবিক অতি ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ১২ জুলাই পর্যন্ত আগামী তিন দিনে (৭২ ঘণ্টায়) চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে এবং এর সংলগ্ন ত্রিপুরা, আসাম, মিজোরাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। অতি বর্ষণে চট্টগ্রামসহ পাহাড়ি অঞ্চলে পানিবদ্ধতা এবং ভূমিধসের আশঙ্কায় সতর্কতা জারি রাখা হয়েছে।

এদিকে আবহাওয়া পূর্বাভাসে জানা গেছে, সুস্পষ্ট লঘুচাপটি উত্তরপশ্চিম মধ্য প্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বিরাজমান রয়েছে। এটি উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে পরবর্তীতে উত্তর-পূর্ব দিকে বাঁক নেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও এর সংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে। মৌসুমী বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় রয়েছে।

আগামী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের ভারী বৃষ্টি, বজসহ বৃষ্টিপাত হতে পারে। দেশের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

সম্পাদকীয় :

লাইসেন্স নং: TRAD/DNCC/013106/2024 বার্তা বিভাগ: [email protected] অফিস: [email protected]

অফিস :

যোগাযোগ: মিরপুর, শেওড়াপাড়া হটলাইন: 09638001009 চাকুরী: [email protected]