দেশজুড়ে বড় বন্যার পদধ্বনি: ২০ জেলা প্লাবিত, কক্সবাজারে পাহাড়ধসে নিহত ২১ ও তীব্র নদীভাঙন

আপলোড সময় : ১০-০৭-২০২৬ ০৭:৩৪:১৫ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১০-০৭-২০২৬ ০৭:৩৪:১৫ পূর্বাহ্ন
ধেয়ে আসছে বড় বন্যা। আষাঢ়ের অবিরাম ভারি বৃষ্টি ও উজানের ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে ইতোমধ্যে দেশের অনেক নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এরই মধ্যে ২০টি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীভাঙনের ফলে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে নদীতীরের হাজার হাজার পরিবার। দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন স্থানের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে।

এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার নদীতীরের নিম্নাঞ্চলও কোথাও কোথাও প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার কিছু কিছু স্থানের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলেও বন্যা দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিপাত এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢলে কুমিল্লার প্রধান নদী গোমতীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে নদীর চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষি জমি তলিয়ে গেছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তা নদী বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার নদীসংলগ্ন নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সব মিলিয়ে বড় ধরনের বন্যার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে।

যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে দেশে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সাংবাদিকদের বলেন, দেশে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই। হঠাৎ বন্যাসহ দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি হিসেবে ৬৪ জেলায় ত্রাণ সহায়তা পাঠিয়েছে সরকার। এর মধ্যে তিন পার্বত্য জেলা ও কক্সবাজার এই ৪ জেলায় ১০ লাখ টাকা, ২০০ মেট্রিক টন করে চাল ও বাকি ৬০ জেলায় ৫ লাখ টাকা ও ১০০ মেট্রিক টন করে চাল সহায়তা পাঠানো হয়েছে। তবে ক্ষয়-ক্ষতির তুলনায় সরকারের ত্রাণ খুবই সামান্য বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বাংলাদেশে প্রতি বছর বন্যায় গড়ে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ১১,৮০০ কোটি টাকা) সমমূল্যের আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকে। এছাড়া সামগ্রিকভাবে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যায় বছরে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩০০ কোটি ডলার, যা দেশের জিডিপির প্রায় ১.৩২ শতাংশ। তাই শুধু ত্রাণ সহায়তা নয়, বন্যা মোকাবিলায় স্থায়ী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এক্ষেত্রে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দূর করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তারা মনে করছেন। বন্যার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে সেচকাজে ব্যবহার এবং নদী ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধানের জন্য এই প্রকল্প দু’টি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।

বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. আইনুন নিশাত বলেন, আসলে বন্যা বা অন্যান্য প্রকৃতিক দুর্যোগে যে পরিমাণ ক্ষতি হয় তার সঠিক হিসাব সম্ভব নয় এবং সেটা পূরণ করাও যায় না। তাই এগুলো প্রতিরোধের জন্য স্থায়ী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। এক্ষেত্রে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প দুটি জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা দরকার। তিস্তা মহাপরিকল্পনা উত্তরাঞ্চলের তিস্তা অববাহিকার ৫টি জেলা যেমন, রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা এবং লালমনিরহাটে বন্যা ও নদীভাঙন প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে। তিস্তা মহাপরিকল্প বাস্তবায়ন হলে বর্ষাকালে উজানের ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভাঙন ঠেকানো এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য পানি ধরে রাখা বা রিজার্ভার হিসেবে কাজ করবে। পদ্মা ব্যারাজ বর্ষাকালে পদ্মা ও এর শাখা নদীতে অতিরিক্ত যে পানি প্রবাহিত হয়, তা ব্যারাজের মাধ্যমে ধরে রাখা যাবে। সংরক্ষিত এই পানি শুষ্ক মৌসুমে উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি জমিতে সেচ ও পানির সংকট মেটাবে। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে যে পানি সংকট সষ্টি হয়, তা নিরসন করে বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা যাবে। এ দু’টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও কৃষি অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। তিস্তা ও পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

কক্সবাজার থেকে শামসুল হক শারেক জানান, টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং সাগরে জোয়ারের প্রভাবে কক্সবাজারে জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেলেও সাগরে পানির উচ্চতা বেশি থাকায় নদীর পানি স্বাভাবিকভাবে নামতে পারছে না। ফলে জেলার (পেকুয়া, চকরিয়া, মাতামুহুরী, ঈদগাঁও, রামু ও সদর) ৬টি উপজেলার অন্তত ৪০টি ইউনিয়নের প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক গ্রামে ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। তলিয়ে গেছে গ্রামীণ সড়ক। নৌকাই এখন অনেক এলাকার একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। পানিবন্দি মানুষ সুপেয় পানি ও খাদ্যসংকটে ভুগছেন। শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। টানা বর্ষণে বীজতলা, আমনের আবাদ, সবজি ক্ষেত এবং চিংড়ি খামারের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাজারো কৃষক ও মৎস্যচাষি। অন্যদিকে, অব্যাহত বর্ষণে পাহাড়ধসের ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে ১৬ জন এবং উখিয়া, পেকুয়া, চকরিয়া ও কক্সবাজার শহরে আরও ৫ জনসহ মোট ২১ জন নারী, পুরুষ ও শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারী প্রায় ৪ লাখ মানুষ এখনও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হলেও অনেকেই জীবিকার তাগিদে সেখানে অবস্থান করছেন।

সিলেট থেকে ফয়সাল আমীন জানান, ৬ দিন ধরে টানা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সিলেটের নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। তবে বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি ভারতের মেঘালয় ও আসাম ও ত্রিপুরা থেকে আসা ঢলে দ্রুত বাড়ছে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি। এতে দুই জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হবিগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধসংলগ্ন খোয়াই নদীর পানিও বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে। এতে শহর ও আশপাশের উপজেলার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সিলেটে আকস্মিক বন্যা ও টিলা ধ্বসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সিলেটে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র। পাশাপাশি চিহ্নিত করা হয়েছে জেলার ১৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ টিলা। টিলায় বসবাসরতদের সর্তক করে যাচ্ছে প্রশাসন।

খুলনা ব্যুরো জানায়, টানা বৃষ্টিপাত এবং নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় খুলনায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অল্প বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে ওয়াসার পাইপলাইন স্থাপনের কাজ চলমান থাকায় বিভিন্ন সড়কে চলাচলে দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা হঠাৎ বৃষ্টির কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। এছাড়া বন্ধ খালগুলোর পানি উপচে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১২৭টি পর্যবেক্ষণাধীন স্টেশনের মধ্যে ৯৩টিতে নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। গড়াই-মধুমতি অববাহিকার নদীগুলো বর্তমানে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও আগামী কয়েক দিন বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কুমিল্লা থেকে সাদিক মামুন জানান, গত কয়েকদিনের ভারী ও মাঝারি বৃষ্টিপাত এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢলে কুমিল্লার প্রধান নদী গোমতীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানির তীব্র স্রোতে নদীর চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষি জমি তলিয়ে গেছে, যার ফলে হাজারো কৃষকের ফসল ও স্বপ্নের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি, একই সঙ্গে নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে বসবাসকারী শত শত ভূমিহীন ও অসহায় মানুষের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় নদীপাড়ের বাসিন্দাদের মাঝে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। সরেজমিনে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার আদর্শ সদরের গোমতীর চর ও বুড়িচং উপজেলার বালিখাড়া, ভান্তি এবং কামারখাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গোমতী নদীর চরের শত শত একর ফসলি জমি এখন পানির নিচে। পানিতে ভেসে রয়েছে করলা, লাউ, চালকুমড়া, বরবটি ও লালশাক, ডাটাসহ বিভিন্ন ধরনের আগাম জাতের শাকসবজি। লোকসানের মাত্রা কিছুটা কমাতে অনেক কৃষককে কোমর সমান পানিতে নেমে আধাপাকা ও অপরিপক্ব ফসল তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করতে দেখা গেছে। নদীর পাড়ের চরে মাচা করে যেসব সবজির উৎপাদন করা হচ্ছে সেখানেও নদীর স্রোতের পানি এসে পড়ায় সবজি পরিচর্যায় চরম ব্যাঘাত ঘটছে।

সিরাজগঞ্জ থেকে সৈয়দ শামীম শিরাজী জানান, বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সিরাজগঞ্জে শুরু হয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন। যমুনা যেন এবার শুধু মাটি নয়, মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি ও অস্তিত্বও গিলে খাচ্ছে। প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি পূর্বপুরুষদের কবরও। নদীর তীব্র স্রোতের সামনে অসহায় হয়ে পড়েছেন সদর, কাজিপুর ও চৌহালী উপজেলার হাজারো মানুষ। জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহের টানা ভাঙনে শতাধিক বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, দোকানপাট, অসংখ্য গাছপালা এবং শত শত বিঘা আবাদি জমি যমুনার গর্ভে বিলীন হয়েছে। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ছে। ঘর হারানোর আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে নদীপাড়ের মানুষের। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে কাজিপুর উপজেলার চরগিরিশ ইউনিয়নে। একসময় যেখানে ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবারের বসবাস ছিল, সেখানে এখন সর্বত্র ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন। স্থানীয়দের ভাষ্য, মাত্র দুই সপ্তাহে অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। যেভাবে নদীতীর ভাঙছে, তাতে আরও শতাধিক পরিবার যেকোনো সময় গৃহহীন হয়ে পড়তে পারে। একই চিত্র চৌহালী উপজেলার বাগুটিয়া ইউনিয়নের চরসলিমাবাদ, ভূতের মোড়, বিনানুই ও ভুসুরিয়া চরাঞ্চলেও। প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলমান ভাঙনে অন্তত ৪০ থেকে ৫০টি বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল ও দোকানপাট নদীগর্ভে চলে গেছে। কৃষকের বছরের পর বছর পরিশ্রমে গড়ে ওঠা শত শত বিঘা ফসলি জমিও নিমিষেই বিলীন হচ্ছে যমুনার বুকে। অন্যদিকে, সদর উপজেলার বাহুকা এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ নদীতে ধসে পড়ে।

রংপুর থেকে হালিম আনছারী জানান, অব্যাহত বর্ষন এবং ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে আবারও বেড়ে চলেছে তিস্তা ও ধরলাসহ বিভিন্ন নদ নদীর পানি। এতে নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়ে পড়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে শত শত হেক্টর ফসলি জমি। বিশেষ করে বিভিন্ন রবিশস্যের ক্ষেত চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

গত কয়েকদিন ধরে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমোরসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে আবার দুয়েক দিন পরেই পানি কমে গিয়ে স্বাভাবিক হলেও গত ২ দিন ধরে তিস্তার পানি বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ইতিমধ্যে বন্যার পানি নদী তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করে বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে এবং নিম্নাঞ্চলের অনেক বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে অনেকেই বসতবাড়ি ছেড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। এতে করে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা ও ভাঙ্গনের আশঙ্কা বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নীলফারীর জলঢাকা, ডোমার ও ডিমলা উপজেলা, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলা এবং রংপুরের গঙ্গাচড়া ও কাউনিয়া উপজেলা এবং কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর চিলমারী উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলে বানের পানি ঢুকে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে পুকুর ডুবে গেছে। অনেক ফসলি জমি ইতিমধ্যে হাঁটু পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন রবিশস্য যেমন মরিচ, ঝিঙ্গা, পটল, ঢেঁড়শসহ শাক-সব্জি ক্ষেতে বন্যার পানি ওঠায় ব্যাপক ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

লক্ষ্মীপুর থেকে এস এম বাবুল (বাবর) জানান, বঙ্গোপসাগরে নিম্মচাপের কারনে লক্ষ্মীপুরে প্রবল বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ঘন্টায় বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে ৫৪ মিলিমিটার। বৃষ্টি অব্যাহত থাকার কারনে পৌরশহরের বাঞ্চানগর, সমসেরাবাদ, কলেজ রোড, মজুপুরসহ বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়ছে পৌরবাসী। এইভাবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে সবজির ব্যাপক ক্ষতি হবে বলে আশংকা করছেন স্থানীয়রা।

নীলফামারী থেকে মোশফিকুর রহমান সৈকত জানান, তিস্তা যেন আবারও গিলে খাচ্ছে উত্তরাঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন। টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় শুরু হয়েছে তীব্র নদীভাঙন। প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটা, গাছপালা ও গ্রামীণ সড়কের অংশ। ঘর হারানোর শঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটছে তিস্তাপাড়ের হাজারো মানুষের। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপজেলার কালিগঞ্জ, গয়াবাড়ী, খালিশা চাপানী, পূর্ব ছাতনাই ও টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী এলাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বহু বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। নদীর কিনারায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে অসংখ্য বসতঘর। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে ঘর খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। কেউ কেউ শেষ সম্বল রক্ষায় দিন-রাত নদীর পাড় পাহারা দিচ্ছেন। কালিগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা হাসান তারেক বলেন, “যেভাবে নদীভাঙন শুরু হয়েছে, তাতে আমরা কোথায় থাকব সেই ঠিকানাই খুঁজে পাচ্ছি না। চোখের সামনে জমি শেষ হয়ে যাচ্ছে, ঘরবাড়ি হারিয়ে যাচ্ছে। এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে আমাদের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে যাবে।”

গাইবান্ধা থেকে আবেদুর রহমান স্বপন জানান, অবিরাম ভারি বর্ষন ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি পানির ঢলে গাইবান্ধার প্রধান নদ নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার তীব্র নদী ভাঙ্গন ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এর ফলে জেলার ৪ উপজেলা অনন্ত ২৫ টি পয়েন্টে নদী ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারন করেছে। ভাঙ্গনের ইতোমধ্যে নদী গর্ভে ২ শতাধিক ঘরবাড়ী বিলীর হয়ে গেছে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে জিও ব্যাগ ও ব্লক দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

শেরপুর থেকে এস. কে সাত্তার জানান, শেরপুরে টানা কয়েক দিনের থেমে থেমে ভারী বর্ষণ এবং উজানে ভারত হতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার প্রধান নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে জেলার ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদী উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কোথাও বসতবাড়িতে পানি ঢুকেছে, আবার কোথাও ফসলি জমি ও সবজি ক্ষেত তলিয়ে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। গতকাল দুপুরের পর হতে ঝিনাইগাতী উপজেলার মহারিশি নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী তীরবর্তী এলাকা এবং সদর বাজারে পানি প্রবেশ করেছে। মহারিশি নদীর পূর্বের ভেঙে যাওয়া অংশ দিয়ে পানি লোকালয়ে ঢুকছে। পানির তীব্র স্রোতে উপজেলার নলকুড়া ইউনিয়নের সন্ধ্যাকুড়া-গোমড়া গ্রামে নদীর তীরবর্তী সবজি ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া অনেকের বসতঘরের ভিটা ভেঙে গেছে। স্থানীয়রা জানান, সবজি গ্রাম হিসেবে পরিচিত সন্ধ্যাকুড়া-গোমড়া গ্রামে মহারিশি নদীর পানি উপচে সবজি ক্ষেতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ভাঙন সৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে। পানি বাড়ায় আশপাশের জনপদে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

মাদারীপুর থেকে আবুল হাসান সোহেল জানান, গত কয়েকদিন ধরেই প্রায় টানা বৃষ্টি হচ্ছে। ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে জেলার বিভিন্ন স্থানে ডুবেছে ফসলের ক্ষেত। সাম্প্রতিক টানা বর্ষন ও নদীর পানি বৃদ্ধিতে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার বাঁশগাড়ী, সাহেবরামপুর, কয়ারিয়া ও মোল্লারহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদের তীব্র স্রোতে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। নদীগর্ভে বসতভিটা ও ফসলি জমি বিলীন হওয়াার আশঙ্কায় কাটছে নদীপাড়ের শত শত মানুষের দিন। খুনেরচর, সাহেবরামপুরসহ নদীতীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা শোচণীয়। বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের খুনেরচর, সাহেবরামপুর, কয়ারিয়া ও মোল্লারহাট এলাকায় ভাঙন দেখা দেয়ায় শতাধিক পরিবার ইতিমধ্যেই গৃহহীন হয়ে পড়েছে।

সম্পাদকীয় :

লাইসেন্স নং: TRAD/DNCC/013106/2024 বার্তা বিভাগ: [email protected] অফিস: [email protected]

অফিস :

যোগাযোগ: মিরপুর, শেওড়াপাড়া হটলাইন: 09638001009 চাকুরী: [email protected]