ইরানকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যকার সম্পর্কে এক বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। একসময় ইরানের ক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেও, তেহরানের শক্তি প্রদর্শনের মুখে এখন নিজের অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ সরে এসেছেন সৌদি যুবরাজ। মার্কিন সরকারের ওপর আস্থা হারিয়ে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এখন মিত্র যুক্তরাষ্ট্রকে তুষ্ট করার চেয়ে নিজ দেশের নিরাপত্তাকেই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। আর এই রণকৌশলগত পরিবর্তনের কারণে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন উত্তেজনা।
পেন্টাগনের নেওয়া ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামের একটি সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে এই বিবাদ চরম আকার ধারণ করে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিতের অজুহাতে মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীকে সৌদি আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি চাওয়া হলে, রিয়াদ তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। মার্কিন প্রশাসন সৌদি আরবের সঙ্গে আগে কোনো পরামর্শ না করেই এই অভিযানের ছক কষেছিল, যা নতুন করে যুদ্ধ ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করেন যুবরাজ। এই ঘটনার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারসহ হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তারা যুবরাজকে মানানোর জন্য দফায় দফায় জরুরি ফোনালাপ করলেও নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন মোহাম্মদ বিন সালমান। ফলে শুরু হওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ বন্ধ করতে বাধ্য হয় ট্রাম্প প্রশাসন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৯ সালে সৌদি তেলক্ষেত্রে ইরানের ড্রোন হামলার পর ট্রাম্পের নিষ্ক্রিয়তা এবং বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের ঘনঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে ওয়াশিংটনের প্রতি রিয়াদের গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব এখন মার্কিন সরকারকে ক্রমেই অবিশ্বস্ত এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনের মুখে নিজের দেশকে রক্ষা করতে রিয়াদ এখন একটি ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যপন্থা নীতি গ্রহণ করেছে। ওয়াশিংটনকে তোয়াক্কা না করে নিজস্ব উদ্যোগে চীন ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে তারা। বিশেষ করে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে পুনরায় জোড়া লাগা কূটনৈতিক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে সরাসরি তেহরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন সৌদি কর্মকর্তারা।
অবশ্য এই টানাপোড়েনের মধ্যেও দুই দেশের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি ও অস্ত্র ক্রয়ের মতো কিছু দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্ব এখনো বজায় রয়েছে। তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কে তিক্ততা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি মিয়ামিতে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প সৌদি যুবরাজকে নিয়ে প্রকাশ্যেই অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন।
এমনকি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাঁর সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সফরে বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত গেলেও সৌদি আরব সফর পুরোপুরি এড়িয়ে যান। হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সাম্প্রতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর উপসাগরীয় দেশগুলোর মনস্তত্ত্ব পুরোপুরি বদলে গেছে। ওয়াশিংটনের নেওয়া যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক চুক্তিতে সৌদি আরব এখনো পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছে না, যার কারণে ইরানের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন তহবিলে কোনো অর্থ দিতেও আপাতত রাজি হয়নি রিয়াদ। সামগ্রিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প এবং সৌদি যুবরাজের মধ্যকার এই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য দুই দেশের ঐতিহাসিক মিত্রতাকে এখন এক বড় পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে।