যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রাথমিক সমঝোতার খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে মার্চ মাসের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে অপরিশোধিত তেলের দাম।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার (১৫ জুন) ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৫৮ ডলার বা ৪ দশমিক ১০ শতাংশ কমে ৮৩ দশমিক ৭৫ ডলারে নেমে আসে।
একই সময়ে মার্কিন বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৪ দশমিক ০১ ডলার বা ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০ দশমিক ৮৭ ডলারে দাঁড়ায়। এর আগে শুক্রবারও উভয় ধরনের তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছিল।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইসলামাবাদের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করবে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিকে ‘টোলমুক্ত’ করা হবে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধও তুলে নেওয়া হবে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহর জানিয়েছে, খসড়া চুক্তি অনুযায়ী ইরানের তত্ত্বাবধানে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতার সম্ভাবনা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, তেলের দামের সঙ্গে যুক্ত ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির অতিরিক্ত মূল্য দ্রুত কমে যাচ্ছে। কারণ বাজার এখন সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছিল। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের নজর রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদক দেশগুলো কত দ্রুত উৎপাদন ও রপ্তানি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারে এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল কত দ্রুত বাড়ে, তার ওপর।
কমনওয়েলথ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার পণ্য কৌশলবিদ বিবেক ধর এক বিশ্লেষণে বলেন, বাজারে এখনও কিছু অনিশ্চয়তা থাকলেও বছরের শেষ নাগাদ ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস বহাল রয়েছে। তার মতে, যুদ্ধ-পূর্ব অতিরিক্ত সরবরাহ পরিস্থিতিতে ফিরতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন আগের মাত্রার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে পৌঁছালেই যথেষ্ট হবে।
এদিকে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদী জানিয়েছেন, ঘোষিত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময় আরও বিস্তৃত একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে। সেই আলোচনায় নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
রোববার যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালিসহ ইউরোপের চারটি প্রভাবশালী দেশও জানিয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অগ্রগতি হলে তারা দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে বিবেচনা করতে প্রস্তুত।
তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, পারমাণবিক ইস্যুকে ঘিরে আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় এখনও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। আইজি গ্রুপের বাজার বিশ্লেষক টনি সাইকামোরের মতে, এই কারণে নিকট ভবিষ্যতে তেলের দাম বর্তমান অবস্থান থেকে আরও বড় ধরনের পতনের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে সীমিত।