ইসলামে ধর্ষণ ও ব্যভিচারের শাস্তি

আপলোড সময় : ০৭-০৬-২০২৬ ০১:৫৭:০৭ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০৭-০৬-২০২৬ ০২:০৯:০৮ পূর্বাহ্ন
▪️যিনা বা ব্যভিচার

ব্যভিচার বলতে শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ বিবাহবন্ধনের বাইরে কোনো নারী-পুরুষের ইচ্ছাকৃত যৌন সম্পর্ককে বোঝায়। ইসলামী পরিভাষায় একে “যিনা” (الزنا) বলা হয়। এটি ইসলামে কবীরা গুনাহ ও জঘন্য অপরাধ হিসেবে গণ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন—

.وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا “তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীলতা এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।” সূরা ইসরা : ৩২

আর ব্যভিচারের শাস্তিও ইসলামে সুনির্ধারিত।অপরাধীরা অবিবাহিত হলে তাদেরকে একশ বেত্রাঘাত করা হবে, আর বিবাহিত হলে তাদের শাস্তি হলো রজম (পা থ র নিক্ষেপে মৃ* ত্যু দণ্ড)। এ বিধান নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে কারো জন্য আলাদা কোনো ছাড় নেই।

অবিবাহিত ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর জন্য একশ বে ত্রা ঘা তের বিধান কুরআনে এসেছে— الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَة جَلْدَةٍ “ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ—তাদের প্রত্যেককে একশ বে ত্রা ঘা ত করো।” সূরা নূর : ২

আর বিবাহিত ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর জন্য রজম (পা থ র নি ক্ষে পে মৃ*ত্যুদণ্ড)-এর বিধান সহীহ হাদীস ও সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত। যেমন—

হযরত আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّهُ قَالَ أَتَى رَجُلٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ فِي الْمَسْجِدِ فَنَادَاهُ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي زَنَيْتُ ‏.‏ فَأَعْرَضَ عَنْهُ فَتَنَحَّى تِلْقَاءَ وَجْهِهِ فَقَالَ لَهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي زَنَيْتُ ‏.‏ فَأَعْرَضَ عَنْهُ حَتَّى ثَنَى ذَلِكَ عَلَيْهِ أَرْبَعَ مَرَّاتٍ فَلَمَّا شَهِدَ عَلَى نَفْسِهِ أَرْبَعَ شَهَادَاتٍ دَعَاهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ ‏"‏ أَبِكَ جُنُونٌ ‏"‏ ‏.‏ قَالَ لاَ ‏.‏ قَالَ ‏"‏ فَهَلْ أَحْصَنْتَ ‏"‏ ‏.‏ قَالَ نَعَمْ ‏‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏"‏ اذْهَبُوا بِهِ فَارْجُمُوهُ ‏"‏ ‏.‏

এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট আসল, তখন তিনি মসজিদে ছিলেন। সে উচ্চস্বরে বলল, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি যিনা করেছি।” রাসূল ﷺ তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সে আবার তাঁর সামনে এসে একই কথা বলল। রাসূল ﷺ আবারও মুখ ফিরিয়ে নিলেন।

এভাবে সে চারবার নিজের বিরুদ্ধে স্বীকারোক্তি দিল। এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে ডেকে বললেন, “তোমার মধ্যে কি পাগলামি আছে?” সে বলল, “না।” তিনি বললেন, “তুমি কি বিবাহিত?” সে বলল, “হ্যাঁ।” তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “তাকে নিয়ে যাও এবং রজম করো। সহীহ বুখারী ৬৮১৫, সহীহ মুসলিম ১৬৯১

আর এ বিষয়ে আরও বহু সহীহ হাদীস বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। তবে আলোচনা দীর্ঘ না করার উদ্দেশ্যে এখানে একটি হাদীসের উপরই সীমাবদ্ধ থাকা হলো।

▪️ধর্ষণ বা জোরপূর্বক ব্যভিচার

ধর্ষণ বা জোরপূর্বক ব্যভিচার হলো—কোনো নারীর সাথে তার ইচ্ছা ও সম্মতি ব্যতীত ভয়-ভীতি,বলপ্রয়োগ, অস্ত্রের হুমকি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অন্য কোনো জবরদস্তিমূলক উপায়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা বা স্থাপনে বাধ্য করা। ইসলামী পরিভাষায় একে “যিনা বিল-জবর” (الزنا بالجبر) বলা হয়। এটি কেবল ব্যভিচারই নয়; বরং চরম জুলুম, মানবিক মর্যাদার লঙ্ঘন এবং ভয়াবহ অপরাধ।

ব্যভিচার ও ধর্ষণের শাস্তির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো—ধর্ষকের উপর ব্যভিচারের নির্ধারিত শাস্তিই কার্যকর হবে। সে বিবাহিত হলে তার শাস্তি রজম (পাথর নিক্ষেপে মৃ*ত্যুদণ্ড), আর অবিবাহিত হলে একশ বে ত্রা ঘাত। পক্ষান্তরে ধর্ষিতা নারীর উপর কোনো শাস্তি বর্তাবে না; কারণ শরীয়তের দৃষ্টিতে তিনি নির্যাতিতা, বাধ্যকৃত ও নিরপরাধ।

ইমাম ইবনে কুদামা রহ. বলেন

ولا حَدَّ على مُكْرَهَةٍ في قولِ عامَّةِ أهلِ العلمِ. رُوِىَ ذلك عن عمرَ، والزُّهْرِىِّ، وقَتَادَةَ، والثَّورِىِّ، والشَّافِعِىِّ، وأصْحابِ الرَّأْىِ. ولا نعلمُ فيه مُخالفًا؛ وذلك لقولِ رسول اللَّه -صلى اللَّه عليه وسلم-: "عُفِىَ لأمَّتِى عن الْخَطإِ، والنِّسْيَانِ، وما اسْتُكْرِهُوا عَلَيْه" (٣٣). وعن عبد الجَبَّارِ بن وائلٍ (٣٤)، عن أبيه، أنَّ (٣٥) امرأةً اسْتُكْرِهَتْ على عهدِ رسولِ اللَّه -صلى اللَّه عليه وسلم- فدَرَأَ عنها الحَدَّ. روَاه الأثْرَمُ “জোরপূর্বক বাধ্যকৃত নারীর উপর কোনো হদ (শাস্তি) নেই—এ ব্যাপারে প্রায় সকল আহলে ইলম একমত। এ মতটি উমর রাযি. ইমাম যুহরী, কাতাদাহ, সাওরী, শাফেয়ী এবং আহলুর রায় (হানাফি ফকীহগণ) থেকে বর্ণিত হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা কোনো ভিন্নমত জানি না।’’ এর দলিল হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী— “আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং যেসব কাজে তাদেরকে জোরপূর্বক বাধ্য করা হয়—সেগুলো ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।”

আর আবদুল জব্বার ইবনে ওয়াইল তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন—“রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে এক নারীকে জোরপূর্বক ব্যভিচারে বাধ্য করা হয়েছিল। তখন নবী ﷺ তার উপর থেকে হদ (শাস্তি) রহিত করেন।” ইমাম ইবনে কুদামা, আল মুগনী ১২/৩৪৭,

ইমাম ইবনে আব্দুল বার রাহ. বলেন—

وَلَا عُقُوبَةَ عَلَيْهَا إِذَا صَحَّ أَنَّهُ اسْتَكْرَهَهَا وَغَلَبَهَا عَلَى نَفْسِهَا وَذَلِكَ يُعْلَمُ بِصُرَاخِهَا وَاسْتِغَاثَتِهَا وَصِيَاحِهَا “যদি এটি প্রমাণিত হয় যে তাকে জোরপূর্বক বাধ্য করা হয়েছে এবং তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার উপর নির্যাতন চালানো হয়েছে, তবে তার উপর কোনো শাস্তি আরোপ করা হবে না। আর বিষয়টি সাধারণত তার চিৎকার, সাহায্য প্রার্থনা ও আর্তনাদ থেকেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।” ইমাম ইবনে আব্দুল বার, আল ইসতিযকার ৭/১৪৬,

ইমাম ইবনে আব্দুল বার রহ. আরও বলেন—

وَاخْتَلَفَ الْفُقَهَاءُ فِي وُجُوبِ الصَّدَاقِ عَلَى الْمُغْتَصِبِ فَقَالَ مَالِكٌ وَاللَّيْثُ وَالشَّافِعِيُّ عَلَيْهِ الصَّدَاقُ وَالْحَدُّ جَمِيعًا. وَقَالَ أَبُو حَنِيفَةَ وَأَبُو يُوسُفَ وَمُحَمَّدٌ وَسُفْيَانُ الثَّوْرِيُّ عَلَيْه الْحَدُّ وَلَا مهر عليه ধর্ষণকারীর উপর “মোহর” (মোহরে মিছল/ক্ষতিপূরণ) ওয়াজিব হবে কি না—এ বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালিক, আল-লাইস এবং ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মতে, ধর্ষণের ক্ষেত্রে অপরাধীর উপর দুটি বিষয়ই প্রযোজ্য—হদ (শরীয়ত নির্ধারিত শাস্তি) এবং মোহরে মিছল (ক্ষতিপূরণ)। অন্যদিকে ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, মুহাম্মদ এবং সাওরী (রহ.)-এর মতে, তার উপর হদ প্রযোজ্য হবে; তবে মোহর (ক্ষতিপূরণ) আলাদাভাবে ওয়াজিব হবে না।ইমাম ইবনে আব্দুল বার, আল ইসতিযকার ৭/১৪৬,

▪️ধর্ষণ কি হিরাবার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে?

আর ধর্ষণ বা বলপূর্বক ব্যভিচার, যা বর্তমান সময়ে আলোচিত একটি ভয়াবহ অপরাধ, এর শাস্তি সব ক্ষেত্রে একই ধরনের হয় না; বরং ঘটনার প্রকৃতি, পদ্ধতি এবং অপরাধের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

যদি এই অপরাধ অস্ত্রের ভয়, অপহরণ, দলবদ্ধ সন্ত্রাস বা জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী কার্যক্রমের মাধ্যমে সংঘটিত হয়, তবে তা কুরআনে বর্ণিত “হিরাবা” ও “ফাসাদ ফিল আরদ”-এর অন্তর্ভুক্ত হবে। ফাসাদ ফিল আরদ-এর অর্থ হলো—পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা, জননিরাপত্তা বিনষ্ট করা এবং মানুষকে ভয়-ভীতি ও আতঙ্কে ফেলে সন্ত্রাসী ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানো।

কুরআন মাজীদে সূরা মায়েদার ৩৩ নম্বর আয়াতে এ ধরনের অপরাধীদের বিষয়ে কঠোর শাস্তির বিধান বর্ণিত হয়েছে। এটি বিবাহিত বা অবিবাহিত—কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির সাথে সীমাবদ্ধ নয়; বরং যে কেউ এই অপরাধে জড়িত হলে তার ক্ষেত্রে শরঈ বিধান প্রযোজ্য হবে। এ ধরনের ফৌজদারি সন্ত্রাসী অপরাধীরা দুটি শাস্তি একত্রে পাওয়ার যোগ্য :

১. অপরাধের শাস্তি। ২. ‘ফাসাদ ফিল আরদ’ তথা সন্ত্রাসের শাস্তি।

আল্লাহ তাআলা বলেন— إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ۚ ذَٰلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا ۖ وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ “যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তাদের শাস্তি হলো—তাদের হত্যা করা হবে, অথবা শূলীতে চড়ানো হবে, অথবা বিপরীত দিক থেকে হাত-পা কে* টে ফেলা হবে, অথবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে…।” সূরা মায়িদা: ৩৩

▪️ধর্ষণের পর হত্যা: কিসাসের বিধান কী?

সাম্প্রতিক ধর্ষণের পর মেয়েদেরকে হত্যাও করা হচ্ছে। ফলে এসব ঘটনা তো নিছক ধর্ষণের নয়, এর সাথে আছে হত্যার অপরাধ। আর এই ধরণের হ*ত্যার বিধান একমাত্র কিসাস তথা মৃত্যুদণ্ড।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, وَلَکُمۡ فِی الۡقِصَاصِ حَیٰوۃٌ یّٰۤاُولِی الۡاَلۡبَابِ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ হে বুদ্ধিমানেরা! কিসাসের ভেতর তোমাদের জন্য রয়েছে জীবন (রক্ষার ব্যবস্থা)। আশা করা যায় তোমরা (এর বিরুদ্ধাচরণ) পরিহার করবে। সুরা বাকারা, আয়াত ১৭৯

▪️ধর্ষণ প্রমাণের শরঈ পদ্ধতি কী?

ক্লাসিক ফিকহে ধর্ষণ প্রমাণের প্রধান ভিত্তিগুলো হলো—

এক. ধর্ষকের ইকরার বা স্বীকারোক্তি

যদি ধর্ষণের অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজে সুস্পষ্টভাবে চারবার স্বীকার করে যে সে জোরপূর্বক যৌন অপরাধ করেছে, তাহলে তার এই স্বীকারোক্তি শরীয়ত ও বিচারিক দৃষ্টিতে শক্ত প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে এবং এর ভিত্তিতে বিচারক তার উপর হদ প্রয়োগের রায় দিবেন।

হযরত আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট আসল, তখন তিনি মসজিদে ছিলেন। সে উচ্চস্বরে বলল, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি যিনা করেছি।” রাসূল ﷺ তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সে আবার তাঁর সামনে এসে একই কথা বলল। রাসূল ﷺ আবারও মুখ ফিরিয়ে নিলেন।

এভাবে সে চারবার নিজের বিরুদ্ধে স্বীকারোক্তি দিল। এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে ডেকে বললেন, “তোমার মধ্যে কি পাগলামি আছে?” সে বলল, “না।” তিনি বললেন, “তুমি কি বিবাহিত?” সে বলল, “হ্যাঁ।” তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “তাকে নিয়ে যাও এবং রজম করো। সহীহ বুখারী ৬৮১৫, সহীহ মুসলিম ১৬৯১

এ হাদীসের ভিত্তিতে হানাফী ও হাম্বলী ফকীহগণ বলেন, ব্যভিচারী বা ধর্ষককে চারবার ব্যভিচার বা ধর্ষণের স্বীকারোক্তি দিতে হবে; এরপর তার উপর হদ কার্যকর করা হবে। পক্ষান্তরে শাফেয়ী ও মালেকী ফকীহগণের মতে, একবার স্পষ্ট স্বীকারোক্তিই হদ প্রয়োগের জন্য যথেষ্ট। তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম ২/৩৮৭, আল ফিকহুল হানাফী ফি সাউবিহিল জাদীদ ৩ /২৫৬, ফাতাওয়া উসমানী ৩/৫৩৭,

দুই. অথবা চারজন সাক্ষীর সাক্ষ্য

ধর্ষণের ক্ষেত্রেও হদ (নির্ধারিত শরয়ি শাস্তি) কার্যকর করার জন্য চারজন প্রাপ্তবয়স্ক, ন্যায়পরায়ণ মুসলিম পুরুষের সাক্ষ্য প্রয়োজন। আল ফিকহুল হানাফী ফি সাউবিহিল জাদীদ ৩ /২৫৫, ফাতাওয়া শামী ৪/৭, সাঈদ সংস্করণ।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন— وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ “যারা সতী-সাধ্বী নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর তাদের দাবির সমর্থনে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না, তাদেরকে আশি বেত্রাঘাত করো এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। তারাই তো প্রকৃত ফাসেক।” সূরা নূর, আয়াত ৪

হাদিসে নববীতে ইরশাদ হয়েছে— عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ سَعْدَ بْنَ عُبَادَةَ، قَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنْ وَجَدْتُ مَعَ امْرَأَتِي رَجُلًا، أَؤُمْهِلُهُ حَتَّى آتِيَ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ؟ قَالَ: «نَعَمْ»."

আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, সা‘দ ইবনু উবাদা রাযি. বলেন—“হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আমি যদি আমার স্ত্রীর সাথে কোনো পুরুষকে পাই, তবে কি আমি তাকে (অর্থাৎ বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য) চারজন সাক্ষী উপস্থিত না করা পর্যন্ত সময় দেব?” নবী ﷺ বললেন: “হ্যাঁ।” সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৪৯৮,

জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া বানূরী টাউন, করাচীর ফতোয়ায় বলা হয়েছে—‘‘ধর্ষণের অপরাধে শরয়ি হদ কার্যকর করার জন্য চারজন সাক্ষী অথবা অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি আবশ্যক। এ দুটির কোনোটি ছাড়া হদ কার্যকর করা যাবে না।

তবে ধর্ষিত নারী যেহেতু জবরদস্তির শিকার ও শরয়ি পরিভাষায় ‘মুকরাহ’, তাই তার উপর কোনো হদ প্রযোজ্য হবে না।’’ জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া বানূরী টাউন, ফাতাওয়া নম্বর 143812200011

▪️মেডিকেল পরীক্ষা ও পারিপার্শ্বিক আলামতের মাধ্যমে ধর্ষণ প্রমাণের শরয়ি অবস্থান

হযরত ইউসুফ আ. এর ঘটনায় কুরআনুল কারীম পারিপার্শ্বিক আলামতের ভিত্তিতে সত্য উদ্ঘাটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত পেশ করেছে। যখন মিসরের আজীজের স্ত্রী হযরত ইউসুফ আ. এর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করেন, তখন মহিলার পরিবারের একজন ব্যক্তি জামা ছেঁড়ার দিককে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন— قَالَ هِيَ ‌رَاوَدَتْنِي ‌عَنْ ‌نَفْسِي، وَشَهِدَ شَاهِدٌ مِنْ أَهْلِهَا إِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ قُبُلٍ فَصَدَقَتْ وَهُوَ مِنَ الْكَاذِبِينَ . وَإِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ فَكَذَبَتْ وَهُوَ مِنَ الصَّادِقِينَ. فَلَمَّا رَأَى قَمِيصَهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ قَالَ إِنَّهُ مِنْ كَيْدِكُنَّ إِنَّ كَيْدَكُنَّ عَظِيمٌ ﴾ [يوسف: 26-28] “ইউসুফ বলল, সেই-ই আমাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেছিল। তখন মহিলার পরিবারের একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিল, ‘যদি তার জামা সামনের দিক থেকে ছেঁড়া হয়ে থাকে, তবে নারী সত্য বলেছে এবং সে মিথ্যাবাদী। আর যদি তার জামা পেছনের দিক থেকে ছেঁড়া হয়ে থাকে, তবে নারী মিথ্যা বলেছে এবং সে সত্যবাদী।’ অতঃপর স্বামী যখন দেখল যে, ইউসুফের জামা পেছনের দিক থেকে ছেঁড়া, তখন সে বলল, ‘এ তো তোমাদের নারীদের কৌশল। নিশ্চয়ই তোমাদের কৌশল বড়ই ভয়ংকর।’”—সূরা ইউসুফ, ১২ : ২৬-২৮

উপরোক্ত আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহিমাহুল্লাহ লিখেছেন—

“এ আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায় যে, মামলা- মোকদ্দমা ও বিচার-ফয়সালার ক্ষেত্রে ইঙ্গিত ও আলামতের সাহায্য গ্রহণ করা যেতে পারে। এখানে সাক্ষ্যদাতা ইউসুফ আ. এর জামার পেছন দিক থেকে ছিঁড়ে যাওয়াকে এ বিষয়ের আলামত হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন যে, তিনি পালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং যুলায়খা তাকে আটকানোর চেষ্টা করছিল।

এ ব্যাপারে সকল ফকীহ একমত যে, ঘটনার প্রকৃত অবস্থা উদ্ঘাটনের জন্য আলামত ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণকে কাজে লাগানো উচিত, যেমন এ ঘটনায় করা হয়েছে। তবে শুধু আলামত ও ইঙ্গিতকেই চূড়ান্ত ও স্বতন্ত্র প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।” মাআরিফুল কুরআন, সূরা ইউসুফ (১২), আয়াত ২৬-২৮-এর তাফসীর।

কাতারভিত্তিক ইসলামি ফতোয়া প্ল্যাটফর্ম IslamWeb.net-এ প্রকাশিত এক ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে—

ফকীহগণ এ বিষয়ে একমত যে, ব্যভিচার চারজন সাক্ষীর কমে প্রমাণিত হয় না; এটি অন্যান্য অপরাধের প্রমাণপদ্ধতি থেকে ভিন্ন। সূরা নূর, আয়াত ৪

সাক্ষ্যদানের শর্ত হলো সাক্ষীরা ন্যায়পরায়ণ (আদিল) হতে হবে এবং তাদের সাক্ষ্য এমন হতে হবে যে তারা সরাসরি ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছে। অর্থাৎ স্পষ্টভাবে অবলোকন করতে হবে—ব্যভিচারের ক্ষেত্রে পুরুষের অঙ্গ নারীর অঙ্গে প্রবেশ করেছে—এবং সাক্ষ্য হবে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায়, কেবল ইঙ্গিত বা ইশারার মাধ্যমে নয়।

ধর্ষণ ও ব্যভিচারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো—ধর্ষণের ক্ষেত্রে নারী শরয়ি দৃষ্টিতে দায়মুক্ত (মুকরাহ) হিসেবে গণ্য হয়; তার উপর কোনো হদ প্রযোজ্য হয় না। বরং সে জবরদস্তির শিকার ও নির্যাতিত হিসেবে বিবেচিত হয় এবং তার জন্য শরয়ি অধিকার ও ক্ষতিপূরণের বিধান প্রযোজ্য হয়।

আধুনিক চিকিৎসা-প্রযুক্তির মাধ্যমে ধর্ষণ প্রমাণকে শরয়ি দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য না বলার একটি যুক্তি হলো—আল্লাহ তাআলা ব্যভিচার প্রমাণের জন্য নির্দিষ্টভাবে চারজন সাক্ষীর শর্ত নির্ধারণ করেছেন এবং সাক্ষ্যগ্রহণের একটি নির্দিষ্ট কাঠামো প্রদান করেছেন। এর উদ্দেশ্য হলো মানুষের ইজ্জত ও গোপনীয়তা সংরক্ষণ করা। তাই এমন বিকল্প পদ্ধতির উপর নির্ভর করা বৈধ নয়, যা শরীয়তের নির্ধারিত প্রমাণ ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।

তবে এটি বলা সঠিক নয় যে ধর্ষণের ক্ষেত্রে সাধারণত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে এর আলামত ব্যভিচারের তুলনায় অধিক স্পষ্ট হতে পারে। কারণ ধর্ষণের শিকার নারী সাধারণত সাহায্যের জন্য চিৎকার করে এবং আশপাশের লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, পক্ষান্তরে ব্যভিচার সাধারণত গোপনীয়তার সাথে সংঘটিত হয়।

আর যদি কোনো নারী সাহায্যের জন্য চিৎকার করে এবং ঘটনাস্থলে কেউ তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করতে দেখে, তাহলে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত করতে পারে। অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বীকারোক্তি প্রদান করলে, তার স্বীকারোক্তিই যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে—কারণ “স্বীকারোক্তিই সর্বোত্তম প্রমাণ।— ফতোয়া নং 70220

ফাতাওয়া দারুল উলুম যাকারিয়া-এর ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে—

যে অপরাধ ফরেনসিক সায়েন্সের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় এবং এর সাথে যদি শরয়ি সাক্ষ্য বা অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি বিদ্যমান থাকে, তবে সে ক্ষেত্রে শরয়ি হদ ও কিসাসের বিধান কার্যকর করা হবে।

আর যদি কোনো শরয়ি সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকে, বরং কেবলমাত্র বৈজ্ঞানিক তদন্তের মাধ্যমেই অপরাধ প্রমাণিত হয়, তাহলে শুধু এই বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে হদ বা কিসাস কার্যকর করা যাবে না।

তবে এ প্রমাণকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা যাবে না; বরং বিচারক (কাজী) তা বিবেচনায় নিয়ে উপযুক্ত তাযীর (বিচারভিত্তিক শাস্তি) প্রদান করতে পারবেন। এর কারণ হলো—হদ ও কিসাসের ক্ষেত্রে শরীয়তের মূল উদ্দেশ্য হলো যথাসম্ভব শাস্তি প্রয়োগে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং সন্দেহের কারণে হদ বাতিল করার নীতি গ্রহণ করা।—ফাতাওয়া দারুল উলূম যাকারিয়া, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৬০

জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বানূরী টাউন-এর ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে—

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে নসব (বংশ পরিচয়), ব্যভিচার বা ধর্ষণ প্রমাণের ক্ষেত্রে ডিএনএ টেস্টকে চূড়ান্ত ও নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা শরীয়তসম্মত নয়। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে সর্বোচ্চ যা প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে, তা হলো একটি সহায়ক বা সমর্থনমূলক আলামত; কিন্তু এটিকে মূল ও চূড়ান্ত দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

ফতোয়ায় আরও উল্লেখ করা হয় যে, আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার দৃষ্টিতেও ডিএনএ টেস্ট সম্পূর্ণ নির্ভুল বা ভুলের সম্ভাবনামুক্ত নয়। বিভিন্ন কারণে এতে ত্রুটি, বিভ্রান্তি বা ভিন্ন ফলাফল আসার সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও একে নসব নির্ধারণের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ও অকাট্য মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা নিশ্চিত নয়।—ফতোয়া নং 143908200093

অন্য এক ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে—

ব্যভিচার বা ধর্ষণ প্রমাণের ক্ষেত্রে ডিএনএ টেস্টের কোনো স্বতন্ত্র শরয়ি গ্রহণযোগ্যতা নেই। শরয়ি দৃষ্টিতে এ ধরনের অপরাধ কেবল তখনই প্রমাণিত হবে, যখন চারজন প্রত্যক্ষদর্শী ন্যায়পরায়ণ মুসলিমের সাক্ষ্য অথবা অভিযুক্তের স্পষ্ট স্বীকারোক্তি পাওয়া যাবে; এর বাইরে অন্য কোনো মাধ্যমে তা শরয়ি হদ হিসেবে সাব্যস্ত হবে না।

তবে যদি ডিএনএ পরীক্ষার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজে স্বীকারোক্তি প্রদান করে, তাহলে সেই স্বীকারোক্তির ভিত্তিতেই অপরাধ প্রমাণিত হবে। জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বানুরি টাউন, ফাতাওয়া 144312100749

সারকথা— ধর্ষণজনিত অপরাধে ইসলামী শরীয়াহর দৃষ্টিতে মূল বিচারনীতি হলো নির্দিষ্ট ও কঠোর প্রমাণের ভিত্তিতে হদ কার্যকর করা। যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি স্পষ্ট ও স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি প্রদান করে, অথবা চারজন ন্যায়পরায়ণ প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবে শরয়ি বিধান অনুযায়ী হদ প্রয়োগ করা হবে।

কিন্তু যদি এই দুইটির কোনোটিই বিদ্যমান না থাকে—অর্থাৎ অভিযুক্ত স্বীকার না করে এবং চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীও না থাকে—তাহলে শরীয়াহ নির্ধারিত হদ কার্যকর হবে না। এই অবস্থায় বিচারক পারিপার্শ্বিক আলামত (قرائن), ফরেনসিক প্রমাণ, ডিএনএ টেস্টসহ আধুনিক বৈজ্ঞানিক উপায়কে সহায়ক প্রমাণ (supporting evidence) হিসেবে বিবেচনায় নিতে পারেন।

এসব আলামতের ভিত্তিতে বিচারক অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ, তদন্ত ও সত্য উদঘাটনের প্রক্রিয়া শুরু করবেন। অনেক ক্ষেত্রে এমন তদন্তমূলক প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বীকারোক্তি প্রদান করতে পারে, যা শরয়ি দৃষ্টিতে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়ে হদ প্রয়োগের ভিত্তি হতে পারে।

▪️হদ প্রমাণিত না হলেও তাযীর আরোপ করা হবে

আর স্বীকারোক্তি বা শরয়ি সাক্ষ্য ব্যতীত শুধু পারিপার্শ্বিক ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে হদ প্রয়োগ করা যাবে না। এই ক্ষেত্রে ইসলামী বিচারব্যবস্থা অপরাধকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে না; বরং তা তাযীর (বিচারভিত্তিক শাস্তি) এর আওতায় নিয়ে আসে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ অপরাধের গুরুত্ব ও প্রমাণের শক্তি অনুযায়ী উপযুক্ত শাস্তি নির্ধারণ ও প্রয়োগ করতে পারেন।

IslamWeb. net-এ প্রকাশিত এক ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে— যদি চারজন সাক্ষী অথবা স্বীকারোক্তির মাধ্যমে হদ প্রমাণিত না হয়, তবে ধর্ষক তাযীর (বিচারভিত্তিক শাস্তি)-এর উপযুক্ত হবে। তাযীর এমন একটি শাস্তি, যার নির্দিষ্ট কোনো পরিমাণ শরীয়তে নির্ধারিত নেই; বরং তা বিচারকের ইজতিহাদ ও বিবেচনার উপর নির্ভরশীল।

অতঃপর যদি ধর্ষণের সাথে অপহরণের মতো কোনো অপরাধ যুক্ত থাকে, তাহলে তা হিরাবা (সামাজিক সন্ত্রাস ও দস্যুতা)-এর অন্তর্ভুক্ত হবে। এ অবস্থায় অভিযুক্ত ব্যক্তি হিরাবার শাস্তির উপযুক্ত হবে—যদি তা শরয়ি প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত হয়। এ ক্ষেত্রে দুইজন সাক্ষীর সাক্ষ্যই যথেষ্ট বলে গণ্য করা হয়; যেমন মালিকী ফকীহ ইবনু ফারহূন রহিমাহুল্লাহ তাঁর তাবসিরাতুল হুক্কাম-এ উল্লেখ করেছেন।—ফতোয়া নং 397813

জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বানূরী টাউন-এর ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে—

‘আর যদি শরয়ি পদ্ধতিতে অপরাধ প্রমাণিত না হয়, কিন্তু সহায়ক সাক্ষ্য-প্রমাণ, পারিপার্শ্বিক আলামত ও বিভিন্ন নিদর্শনের ভিত্তিতে বিচারকের নিকট অপরাধ সংঘটনের ব্যাপারে প্রবল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তিনি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তাযীরমূলক শাস্তি আরোপ করতে পারবেন।’ জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বানুরি টাউন, ফাতাওয়া নম্বর 144107200593

অন্য এক ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে— ‘ধর্ষণে যেহেতু জোর-জবরদস্তি ও সামাজিক ফাসাদ বিদ্যমান, তাই “ফাসাদ ফিল আরদ”-এর অন্তর্ভুক্ত হিসেবে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ তাযীরস্বরূপ কঠোর শাস্তি আরোপ করতে পারে, যার সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে।’ জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বানুরি টাউন, ফাতাওয়া নম্বর 143410200046

হদ ও তাযীরের মধ্যে পার্থক্য হলো—হদের শাস্তি শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত ও সুনির্দিষ্ট; পক্ষান্তরে তাযীরের পরিমাণ ও ধরন শাসক বা বিচারকের ইজতিহাদ ও বিবেচনার ওপর ন্যস্ত।

হদের ক্ষেত্রে সন্দেহের কারণে শাস্তি রহিত হয়ে যায়; কিন্তু তাযীরের ক্ষেত্রে সেই সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও তাযীরমূলক শাস্তি আরোপ করা আবশ্যক হয়। ফাতাওয়া শামী ৬/৬০, সাঈদ সংস্করণ।

তাযীরের শাস্তির কোনো নির্ধারিত পরিমাণ নেই। এর পরিধি বেত্রাঘাত থেকে শুরু করে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। যেহেতু তাযীরের শাস্তি ইসলামী শরীয়তে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়নি, তাই রাষ্ট্রপ্রধান বা আদালত অপরাধের প্রকৃতি, তার ভয়াবহতা এবং সমাজের ওপর তার ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনা করে তাযীরস্বরূপ মৃ*ত্যুদণ্ডও নির্ধারণ করতে পারেন, যদি তা জনস্বার্থ রক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় মনে হয়। ফাতাওয়া শামী ৬/১০৭, আল ফিকহুল হানাফী ফি সাউবিহিল জাদীদ ৩/৩১০

▪️হুদুদ, কিসাস ও তাযীর কার্যকরের দায়িত্ব কার?

ফুকাহায়ে কেরামের সর্বসম্মত নীতিমতে, হুদুদ, কিসাস ও তাযীরের মূল শাস্তি কার্যকর করার অধিকার সাধারণ জনগণের নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ বা বৈধ শাসকের একচ্ছত্র দায়িত্ব।

ফিকহগ্রন্থসমূহে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন বাদায়েউস সানায়ে, বিদায়াতুল মুজতাহিদ, রওযাতুত তালিবীন এবং আল-মওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে দণ্ডবিধি প্রয়োগের দায়িত্ব শাসক বা রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার ওপর ন্যস্ত।

তদ্রূপ হিদায়া গ্রন্থে-এও উল্লেখ রয়েছে যে হদ কার্যকর করা রাষ্ট্রপ্রধান বা তার প্রতিনিধির দায়িত্ব। এমনকি কোনো ব্যক্তি সালিশ বা মীমাংসাকারীর ভূমিকায় থাকলেও তার জন্য হুদুদ বা কিসাস কার্যকর করার অধিকার নেই।

অতএব ইসলামী শরীয়াহর দৃষ্টিতে বিচার ও শাস্তি ব্যক্তিগতভাবে বা জনতার হাতে অর্পণ করা বৈধ নয়। হুদুদ ও কিসাস কার্যকর করা সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। কেউ নিজ উদ্যোগে এসব শাস্তি প্রয়োগ করলে তা শরীয়াহসম্মত পদ্ধতি হিসেবে গণ্য হয় না; বরং তা বিশৃঙ্খলা, অবিচার ও ফিতনার কারণ হতে পারে।

ইসলাম অপরাধ দমনের পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে রয়েছে—প্রমাণ যাচাই, সাক্ষ্য গ্রহণ, তদন্ত, সন্দেহ দূরীকরণ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণের সুসংগঠিত কাঠামো। এই দায়িত্ব ব্যক্তিগত বা জনসমষ্টির নয়; বরং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের অধীন।

▪️ইসলামী দণ্ডনীতিতে শাস্তির সামাজিক দৃশ্যমানতা

ইসলামী দণ্ডবিধির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—কিছু ক্ষেত্রে শাস্তিকে জনসম্মুখে কার্যকর করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অপরাধ কেবল ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা সামাজিকভাবে দৃশ্যমান হয়, যাতে মানুষ অপরাধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারে এবং নৈতিক সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন থাকে। এর ফলে সমাজে পাপকে স্বাভাবিকীকরণের প্রবণতা রোধ হয়।

ব্যভিচারের শাস্তি প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِنْ كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۖ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ—তাদের প্রত্যেককে একশত বে*ত্রা ঘাত করো। আল্লাহর বিধান কার্যকর করতে গিয়ে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী হও। আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। সূরা আন-নূর: ২

এখানে “وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ”— অর্থাৎ “মুমিনদের একটি দল যেন শাস্তি প্রত্যক্ষ করে”—এই নির্দেশনা নিছক আনুষঙ্গিক বিষয় নয়; বরং এটি ইসলামী দণ্ডনীতির একটি মৌলিক নীতিকে প্রকাশ করে। ইসলামী শরীয়াহ মনে করে, নৈতিকতা কেবল ব্যক্তিগত জ্ঞান বা পাঠের মাধ্যমে গড়ে ওঠে না; বরং সমাজে মূল্যবোধের দৃশ্যমানতা, অপরাধের প্রতি সামাজিক অবস্থান এবং প্রকাশ্য প্রতিরোধমূলক পরিবেশ মানুষের চিন্তা ও আচরণ গঠনে গভীর ভূমিকা রাখে।

সংগৃহীত- Khairul Islam, হানাফী ফিকহ ফেসবুক গ্রুপ থেকে

সম্পাদকীয় :

লাইসেন্স নং: TRAD/DNCC/013106/2024 বার্তা বিভাগ: [email protected] অফিস: [email protected]

অফিস :

যোগাযোগ: মিরপুর, শেওড়াপাড়া হটলাইন: 09638001009 চাকুরী: [email protected]