ইরান গত কয়েক দশকে পাহাড় ও ভূগর্ভের গভীরে এমন এক গোপন সামরিক অবকাঠামো তৈরি করেছে, যা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জন্য বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ‘মিসাইল সিটি’ নামে পরিচিত এসব ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিতে রয়েছে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের এই গোপন সামরিক নেটওয়ার্ক নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি) পরিচালিত এসব মিসাইল সিটি মূলত পাহাড়ের নিচে বা মাটির গভীরে নির্মিত বিস্তৃত সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্স। আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষক সংস্থা সিএসআইএসের তথ্য অনুযায়ী, এগুলো শুধু অস্ত্র সংরক্ষণের জায়গা নয়; বরং পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পরিচালনার উপযোগী স্বয়ংসম্পূর্ণ সামরিক কেন্দ্র। অনেক ঘাঁটি মাটির প্রায় ৫০০ মিটার বা ১,৬০০ ফুট গভীরে অবস্থিত বলে ধারণা করা হয়।
২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এসব স্থাপনার কিছু অংশ প্রকাশ্যে আনে। পরে বিভিন্ন সময়ে আইআরজিসি প্রকাশিত ভিডিও ও ছবিতে ভূগর্ভে সংরক্ষিত বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে ‘ইমাদ’, ‘খাইবার শিকান’, ‘সেজ্জিল’, ‘হজ কাসেম’ এবং সম্প্রতি উন্মোচিত ‘ফাত্তাহ’ হাইপারসনিক মিসাইল। ইরানের দাবি, এসব ক্ষেপণাস্ত্র দুই হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে আঘাত হানতে সক্ষম।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পাল্লার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ছাড়াও ইসরাইলসহ বৃহত্তর অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগের অন্যতম কারণ।
মিসাইল সিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘রেল-মাউন্টেড লঞ্চার’ প্রযুক্তি। সুড়ঙ্গের ভেতরে রেললাইনের ওপর স্থাপন করা ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেয়া যায়, যা হামলার সময় দ্রুত মোতায়েনের সুবিধা দেয়। এছাড়া কিছু ভিডিওতে ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিতে যুদ্ধবিমান ও নৌযান রাখার ব্যবস্থার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মোকাবিলার জন্য এসব স্থাপনায় পানির সংরক্ষণাগার, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জেনারেটর, সেনাদের ব্যারাক এবং চিকিৎসা সুবিধাও রাখা হয়েছে। ফলে ভূপৃষ্ঠের সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিগুলো থেকে দীর্ঘ সময় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব বলে ধারণা করা হয়।
ইরানের পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলে বিস্তৃত জাগরোস পর্বতমালার কঠিন পাথরের ভেতর এসব ঘাঁটির বড় অংশ নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির আশপাশেও একাধিক সুড়ঙ্গ ঘাঁটির অবস্থান রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অবস্থান থেকে ইরান সমুদ্রপথের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা ধরে রাখতে চায় বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।