বাংলাদেশে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে, যার পেছনে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, অনিয়মিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন চিকিৎসকরা। তারা সতর্ক করে বলছেন, বর্তমান জীবনধারার পরিবর্তন তরুণ প্রজন্মকে নীরবে ডায়াবেটিসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে ডায়াবেটিসকে মূলত মধ্যবয়সী বা বয়স্কদের রোগ হিসেবে দেখা হলেও এখন তা তরুণদের মধ্যেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। নগরজীবনের ব্যস্ততা ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা দৈনন্দিন অভ্যাসে বড় পরিবর্তন এনেছে, যা এই ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের কারণে তরুণদের শারীরিক কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফাস্টফুড, কোমল পানীয় ও উচ্চ চিনি সমৃদ্ধ খাবারের প্রতি ঝোঁক, যা স্থূলতা ও বিপাকজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, রাত জেগে স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে, যা শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স গড়ে ওঠে, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের পূর্বধাপ হিসেবে বিবেচিত।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘসময় বসে থাকা এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাবে শরীরের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমে যায়। এতে প্রথমে প্রি-ডায়াবেটিস এবং পরে পূর্ণাঙ্গ ডায়াবেটিসে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
প্রি-ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এই অবস্থায় রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলেও তা ডায়াবেটিসের পর্যায়ে পৌঁছায় না। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, খালি পেটে রক্তে শর্করার মাত্রা ১০০ থেকে ১২৫ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার হলে তা প্রি-ডায়াবেটিস হিসেবে বিবেচিত হয়।
চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন, প্রি-ডায়াবেটিস অনেক সময় স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই শরীরে অবস্থান করে। তবে অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ঝাপসা দৃষ্টি, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া ও অতিরিক্ত ক্ষুধার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানো জরুরি।
ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে তা হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা, স্নায়ু ক্ষতি, দৃষ্টিশক্তি হ্রাসসহ নানা জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণ বয়সে এই রোগ শুরু হলে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।
বংশগত কারণ ও মাতৃস্বাস্থ্যের প্রভাব নিয়েও চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মায়েদের সন্তানদের ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস ও স্থূলতার ঝুঁকি বেশি থাকে, তবে গর্ভাবস্থায় সঠিক নিয়ন্ত্রণে রাখলে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
ইনসুলিন থেরাপি নিয়ে ভীতি দূর করার আহ্বান জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এটি শরীরের স্বাভাবিক হরমোনের কৃত্রিম রূপ এবং অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি। সময়মতো ইনসুলিন ব্যবহার করলে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
এছাড়া ‘হাইপোগ্লাইসেমিয়া’ বা রক্তে শর্করা অতিরিক্ত কমে যাওয়ার ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছেন চিকিৎসকরা। এই অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসকদের পরামর্শ—স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা, নিয়মিত ব্যায়াম, প্রতিদিন অন্তত ৩০–৪০ মিনিট হাঁটা, পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা। পাশাপাশি চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে আঁশসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত রোগ নির্ণয়, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন নিশ্চিত করতে পারলেই তরুণদের মধ্যে ডায়াবেটিসের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি কার্যকরভাবে কমানো সম্ভব।