পদ্মার চরের মানুষের দুর্দশা: শিক্ষা, চিকিৎসা ও মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত জীবন

আপলোড সময় : ২৪-০৪-২০২৬ ০৯:২২:৪৬ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৪-০৪-২০২৬ ০৯:২৯:৩০ অপরাহ্ন

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পদ্মার চরাঞ্চলে বসবাস করছে হাজার হাজার মানুষ। প্রকৃতির সৌন্দর্যে ঘেরা এই অঞ্চলগুলো যেন এক ভিন্ন জগত, যেখানে আধুনিক সভ্যতার অনেক সুবিধাই এখনো পৌঁছায়নি। বছরের পর বছর ধরে এসব চরবাসী শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ- ধরনের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

চরাঞ্চলের বড় সমস্যা হচ্ছে অনিশ্চয়তা। নদী ভাঙন এখানে নিত্যদিনের ঘটনা। একটি পরিবার বছরের পর বছর ধরে যে জমিতে বসবাস করে, একদিন হঠাৎ করেই তা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ফলে মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। এই ভাঙন শুধু ঘরবাড়িই কেড়ে নেয় না, কেড়ে নেয় তাদের জীবিকার প্রধান উৎস—চাষের জমি ও ফসল। যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা চরবাসীর জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। অধিকাংশ চরেই পাকা রাস্তা নেই। বর্ষাকালে পুরো এলাকা পানিতে ডুবে যায়, তখন নৌকাই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা। জরুরি প্রয়োজনে, বিশেষ করে অসুস্থ রোগী বা প্রসূতি মায়েদের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে সময়মতো ব্যবস্থা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে অনেক সময় চিকিৎসার অভাবে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।

শিক্ষা খাতেও চিত্র খুবই হতাশাজনক। অনেক চরেই বিদ্যালয় নেই, আর যেখানে আছে সেখানেও পর্যাপ্ত শিক্ষক ও শিক্ষাসামগ্রীর অভাব রয়েছে। বিদ্যালয়ে যাতায়াতের ঝুঁকি, দারিদ্র্য এবং পারিবারিক চাপের কারণে অনেক শিশুই অল্প বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। ফলে একটি বড় অংশ অশিক্ষিত থেকে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়নের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা প্রায় অনুপস্থিত বললেই চলে। চরাঞ্চলে সরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের সংখ্যা অত্যন্ত কম। সামান্য অসুখ-বিসুখের চিকিৎসার জন্যও অনেক দূরে যেতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু এবং বৃদ্ধদের জন্য এটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে কুসংস্কার ও অজ্ঞতার কারণে সঠিক চিকিৎসাও নেওয়া হয় না।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও চরবাসী চরম সংকটে রয়েছে। তাদের প্রধান জীবিকা কৃষি, মাছ ধরা এবং গবাদি পশু পালন। কিন্তু নদী ভাঙন এবং খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসল উৎপাদন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে ঋণের বোঝা বাড়ে এবং অনেক পরিবার দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে যায়। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় তারা অন্য কোথাও গিয়েও স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারে না।

বিশুদ্ধ পানীয় জল, বিদ্যুৎ, স্যানিটেশনসহ অন্যান্য মৌলিক সুযোগ-সুবিধাও পর্যাপ্ত নয়। আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত।

চরবাসীর এই দুর্দশা নিরসনে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। টেকসই বাঁধ নির্মাণ, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিশেষ বরাদ্দ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করলে চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান অনেকটাই উন্নত হতে পারে।

পদ্মার চর শুধু ভৌগোলিক অবস্থান নয়, এটি হাজারো মানুষের জীবন-সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। এই মানুষদের উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

সম্পাদকীয় :

লাইসেন্স নং: TRAD/DNCC/013106/2024 বার্তা বিভাগ: [email protected] অফিস: [email protected]

অফিস :

যোগাযোগ: মিরপুর, শেওড়াপাড়া হটলাইন: 09638001009 চাকুরী: [email protected]