সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় আড়াই হাজার ফুট উচ্চতায় বান্দরবানের উঁচু-নিচু সবুজ পাহাড়ের মাঝ দিয়ে চলে গেছে আলীকদম-থানচি সড়ক। পাহাড়ের ফাঁকে মেঘের আনাগোনা দেখে আর রোমাঞ্চকর বাঁক পেরিয়ে যেতে যেতে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যায় মন।
এ সড়কের ডিম পাহাড়ের ২৩ কিলো এলাকায় পৌঁছালে রাস্তার বাঁ পাশে হঠাৎ দেখা যায় গাড়ি চলাচলের একটি সরু পথ। অংশটি এমন ছোট বুনো লতায় ঢাকা; কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই যে এ পথ দিয়ে ট্রাকও চলাচলে করে।
কিন্তু সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ওই সরু পথ দিয়েই বেরিয়ে আসে ত্রিপলে ঢাকা একটি ট্রাক। সেই ত্রিপলের নিচে লুকিয়ে রাখা কাটা গাছ।
গাড়িতে দুজন শ্রমিক বসে ছিলেন। গাড়ির পেছনে ছিলেন আরেক শ্রমিক। ট্রাকের ছবি তুলতে দেখে সেই শ্রমিক বনের রাস্তা ধরে দৌড়ে পালিয়ে যান। আর গাড়িটিও চলে যায় সোজা আলীকদমের দিকে।
পরে যে পয়েন্ট থেকে ট্রাকটি বের হয়েছে; সে পথ ধরে ভেতর ঢুকে দেখা যায়, রাস্তাটি একেবারে নিচের দিকে চলে গেছে। ভয়ঙ্কর খাড়া সে পথ ধরে মিনিট ১৫ যাওয়ার পর হঠাৎ চোখে পড়ে একটু পরপর জমা করে রাখা বড় বড় কাটা গাছের স্তূপ।
কোনো কোনো গাছকে কেটে দুফালি করে রাখা হয়েছে। ‘রদ্দা’ (চার কোনা আকার) করেও রাখা হয়েছে কোনো কোনো গাছ। কোথাও পড়ে আছে কেটে নিয়ে যাওয়া গাছের গোড়া।
আরও নিচে গিয়ে দেখা যায়, পাথরে ঢাকা এক ঝিরির মুখে বড় বড় গাছের বিশাল স্তূপ। পড়ে আছে আরও অনেক লম্বা গাছ। সবচেয়ে বেশি গাছের স্তূপ সেখানে। চারপাশে তাকালে চোখে পড়ে কেটে ফেলে রাখা টুকরো গাছ আর গাছ।
ঝিরির কোনো কোনো অংশে পাহাড় ও পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে গাড়ি চলাচলের রাস্তা।
কাটা গাছের বিশাল স্তূপে চাপা পড়া ‘ব্যাঙঝিরি’ কয়েকটি পাড়ার খাবার পানির উৎস। আর এ ঝিরি ধরে দুই আড়াই কিলোমিটারজুড়ে পাড়াবনের বড় গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে।
‘পাড়াবন’ অনেকের কাছে ‘পাড়াবাম’ ও ‘রিজার্ভ বন’ নামেও পরিচিত। পাহাড়িদের কোনো একটি পাড়ায় তার আশপাশে ‘অ-শ্রেণিভুক্ত’ বনাঞ্চলে একটি নির্দিষ্ট বড় এলাকা নিয়ে এ বনভূমি সংরক্ষণ করে রাখা হয়।
পাড়াবাসীর দ্বারা পরিচালিত এসব বনের প্রাকৃতিক সম্পদগুলো সামাজিকভাবে ব্যবহার করা হয়। নিজেদের প্রয়োজনে তারা বনের সম্পদ ব্যবহার করেন। মৌজা প্রধান হেডম্যান ও গ্রামপ্রধান কারবারিরা এটাকে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন।
তবে সামাজিক মালিকানা হলেও পাড়াবনের বড় গাছ কাটার জন্য বনবিভাগের অনুমতি লাগে। অনুমতি ছাড়া বড় গাছ কাটার নিয়ম নেই।
বনে শ্রমিকদের ঘর:
সোমবার সরেজমিনে গিয়ে এই ঝিরির নিচে দুই-তিনশ গজ দূরে তৈরি করা দুটো ঝুপড়ি ঘর পাওয়া যায়। একটি ঘরের ভেতর প্রায় নয়-দশজন থাকার মত জায়গা। ঘরের ভেতর দুটো গাছ কাটার মেশিনও রয়েছে।
রান্না করে খাওয়ার জন্য ঝিরি থেকে পাইপ দিয়ে পানির লাইনও টানা হয়েছে। পানি টানার মোটর চালাতে আছে ‘সোলার প্যানেল’। বাইরে শ্রমিকদের কাপড়-চোপড় শুকানো হচ্ছে।
দুজন শ্রমিক তখনও রান্নার কাজে ব্যস্ত। তাদের একজন মো. ইসমাইল নিজেকে মাঝি (শ্রমিকদের দলনেতা) হিসেবে পরিচয় দিলেন।
সাংবাদিকদের তিনি বললেন, তার বাড়ি কক্সাবাজার জেলার চকরিয়া এলাকায়। আলীকদমের আবু হান ইসমাইল নামে একজন গাছের সওদাগর তিন-চার মাস আগে তাকে নিয়ে এসেছেন। মূলত আবু হান ইসমাইলের নির্দেশেই গাছগুলো কাটা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সাত-আটজন শ্রমিক রয়েছে। দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মজুরিতে এই গাছ কাটা হচ্ছে। এখানে বেশির ভাগ লালি গাছ ও তুলা গাছ রয়েছে। দামি গাছের মধ্যে একটা মাত্র বৈলাম গাছ পাওয়া গেছে।
ইসমাইল বলেন, “আমরা কাজ করে খাওয়া মানুষ। চকরিয়া এলাকায় একদিন কাজ পাওয়া গেলে আরেকদিন পাওয়া যায় না। কয়েক দিন বসে থাকতে হয়। তাই যে কোনো জায়গায় কাজ পেলে সেখানে গিয়ে কাজ করি।
“একটানা কয়েক মাস কাজ পাওয়ার আশায় এখানে আসছি। আসছি বেশি দিন হয়নি। এর আগে এখানে কারা কাজ করে গেছে আমার জানা নেই।”
বাকি শ্রমিকরা কোথায় জানতে চাইলে ইসমাইল মাঝি বলেন, “আপাতত গাছ কাটা শেষ। এখন যে কোনো সময় বৃষ্টি হতে পারে। আর গাছ কাটা হচ্ছে না। শ্রমিকরা যে যার এলাকায় চলে গেছে। এখন ট্রাকে করে গাছ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। দিনে একবারই টানা হয়। বেশি হলে দুইবারের বেশি গাছ টানা যায় না।”
ঝিরির পাশ দিয়ে পাহাড় কেটে আরও নতুন রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে ইসমাইল মাঝি বলেন, “এটা থানচির আরেক গ্রুপের কাজ। আমরা কাটছি না। ওইদিকে খুব বেশি আর গাছ নাই। খরচ উঠবে না দেখে এতটুকুতে রাস্তা তৈরির কাজ বন্ধ করে দিয়েছে শুনছি।”
শামসুল আলম নামে আরেজন শ্রমিক বললেন, তার বাড়িও চকরিয়ায়। এখানে গাছ কাটার কাজে এসেছেন ১৮ দিন আগে। দৈনিক ৪৫০ টাকার মজুরিতে রান্না ও গাছ নামানোর কাজে নিয়োজিত রয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, আলীকদমে তার একজন মামা রয়েছে। তিনি বন থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে বিক্রি করেন। গাছের সওদাগর আবু হান ইসমাইলের বাড়ির পাশে থাকেন তার মামা। তিনিই খবর দিয়ে তাকে নিয়ে আসেন।
তবে ইসমাইল মাঝির গাছ কাটা শেষ- এমন দাবি ঠিক নয় বলেই মনে হয়েছে পরিস্থিতি দেখে। কারণ ঝিরির আশপাশে কাটা গাছের অবস্থা দেখে বোঝা যায়, অনেক গাছের পাতা তখনও শুকায়নি। গাছের গোড়ার মাটি তখনো ভেজা। হয়তো আগের দিন বা সকালেই গাছগুলো কাটা হয়েছে।
‘লাকড়ি সংগ্রহ’ করতে গিয়ে জড়িয়ে গেছেন!:
গাছ কাটার ব্যাপারে আবু হান ইসমাইলকে ফোন দেওয়া হলে তিনি বলেন, “আমি মূলত আলীকদমের পান বাজার এলাকায় পানের ব্যবসা করি। পানের দোকান রয়েছে। গাছের ব্যবসায় নতুন। মাত্র তিন মাস হয়েছে ওখান থেকে শুধু লাকড়ি সংগ্রহ করছি।”
তিনি দাবি করেন, “লংলে ম্রো নামে একজনের কাছ থেকে লাকড়ি হিসেবে ব্যবহারের জন্য কিনে নিয়েছিলাম। কোনো গাছ কাটার জন্য নয়। সে বলছিল, জুমের জন্য পোড়ানোর পর গাছগুলো এমনি পড়ে থাকবে। সেগুলো কিনে লাকড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে পারব।”
কিন্তু ঝিরিপথের দুই-আড়াই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাড়াবনের গাছগুলো কাটা হয়েছে। গাছ টানার জন্য পাহাড় ও পাথর কেটে রাস্তাও তৈরি করা হয়েছে। সেখানে তার নাম বারবার আসছে। শ্রমিকরাও গাছ কাটার কথা স্বীকার করেছেন।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে অভিযোগ অস্বীকার করে আবু হান ইসমাইল বলেন, “পাহাড় কেটে যারা রাস্তা তৈরি করেছে, তারাই বড় গাছ কেটেছে। তারা থানচি এলাকার গাছ ব্যবসায়ী। তারা কারা আমারও জানা নেই।”
তিনি বলেন, “শুধু লাকড়ি সংগ্রহ করতে গিয়ে শেষের দিকে এসে আমি জড়িয়ে গেছি। এটা আমার বড় ভুল হয়েছে। সেখানে এত সমস্যা আছে জানলে আমি জড়াতাম না। আমি লাকড়িগুলো আলীকদমের ইটভাটা ও তামাকের চুল্লিতে বিক্রি করি।
“এরপর থেকে এই ব্যবসায় আর জড়াব না। আজকে (সোমবার) শ্রমিকদের সেখান থেকে নামিয়ে এনেছি।”
কিন্তু স্থানীয়দের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মঙ্গলবার সারাদিনও অভিযানের ভয়ে ট্রাকে করে গাছ সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
‘ব্যাঙঝিরির’ নিচের পামিয়া পাড়ার বাসিন্দা লাইরু ম্রো বলেন, “ঝিরির আশপাশে কোথাও কোথাও মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। সাংবাদিক আসার খবর শুনে শ্রমিকদের কেউ জানিয়ে দিয়েছে হয়ত। বাকি শ্রমিকরা জঙ্গলে কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারে।
“সাংবাদিকরা চলে যাওয়ার পর সারাদিন আরও গাছ টানছে। এমনকি অভিযানের ভয়ে রাতেও ট্রাকে করে গাছগুলো নিয়ে গেছে। মাটি কাটার যন্ত্র একটা এক্সক্যাভেটরও ছিল শুনেছি। সেটাও জঙ্গলে লুকিয়ে রাখতে পারে তারা।”
অভিযোগ-বাধায়ও থামেনি বন উজাড়:
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০২৪ সালের শেষ থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত এই ‘পাড়াবনে’ ঢুকে বড় বড় গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন সময় তারা কয়েক দফা বাধা দিয়েও থামাতে পারেননি গাছ কাটা।
কেবল বর্ষাকালের কয়েক মাস ছাড়া প্রতিনিয়ত নির্বিঘ্নে গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এমনকি গাছ টানতে ঝিরির উপর ট্রাক চলাচল করায় এবং গাছের স্তূপ করার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকটি পাড়ার খাবার পানির উৎসও।
পাড়াবাসীর ভাষ্য, এ বছর জানুয়ারির দিকে প্রথমে আলীকদম সেনা জোন ও পরে উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
লাইরু ম্রো বলেন, “২০২৪ সালে শেষের দিকে যখন গাছ কাটা শুরু করে তখন আমরা বাধা দিয়েছিলাম। কোনো কাজ হয়নি। এ বছর শুরুর দিকে একইভাবে বাধা দিতে গিয়েছিলাম। তারা একজন ম্রোর কাছ থেকে বাগান কেনার কথা বলে। অথচ এটা একটা সংরক্ষণ করে রাখা পাড়াবন।”
তিনি বলেন, “উপায় না পেয়ে এ বছর জানুয়ারি দিকে প্রথমে আলীকদম সেনা জোন এবং পরে ইউএনও কার্যালয়ে অভিযোগ দিয়েছিলাম।
“সেনা জোন থেকে তখন আমাদেরকে বলা হয়েছিল, একমাস পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর ইউএনও কার্যালয় থেকে পুলিশ এবং বনবিভাগের সহযোগিতা নিতে পরামর্শ দিয়েছিল।”
কিন্তু গাছ কাটা আর বন্ধ হয়নি। পরে উপায় না পেয়ে তারা গাছ কাটার ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেন বলে জানান তিনি।
আগের মত পানি পাওয়া যাচ্ছে না:
একসময় সেখানকার ওই ঝিরিতে ছোট ছোট প্রচুর ব্যাঙ ও ব্যাঙাচি পাওয়া যেত। এই কারণে স্থানীয়রা নাম দিয়েছে ‘ব্যাঙঝিরি’।
আলীকদমের চৈক্ষ্যং ইউনিয়নে চারটি পাড়া- পামিয়া পাড়া, তুংতুই পাড়া, নামসাক পাড়া ও খাকই পাড়া এবং লামা উপজেলার রূপসীপাড়া ইউনিয়নের দুটি পাড়া কুইরিং ও সাংক্লা পাড়া এই ঝিরির উপর নির্ভরশীল।
ঝিরির উৎসমুখ ও তার আশপাশে গাছ কেটে ফেলায় এই পাড়াগুলো একসময় পানি সংকটে পড়তে শুরু করেছে।
পানি সংকটের কথা তুলে ধরে পামিয়া পাড়ার আরেক বাসিন্দা মেনচং ম্রো বলেন, “গাছ কাটার আগে ঝিরিতে ভালভাবে পানি পাওয়া যেত। এখন আগের মত আর পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
“পাড়াবন থেকে এভাবে গাছ কাটা বন্ধ করার কেউ নেই। আমরা গিয়ে কয়েকবার বাধা দিয়েছি। কোনোভাবে বন্ধ করা যায়নি।”
স্থানীয় বাসিন্দা মেনরাও ম্রো বলেন, “এটা সংরক্ষিত পাড়াবন। তবে আয়তন কত পরিমাণ আছে সঠিকভাবে কারও জানা নেই। ধারণা করা হচ্ছে ৫০ একরের মত হবে।
“এখানে বন্য শুকর, হরিণ, বন মোরগ, বানর ছিল। গত বছর এই এলাকায় দুটো ভালুকও দেখা গেছে। গাছ কেটে ফেলে বন ধ্বংস হওয়ায় এগুলো আর কিছুই থাকবে না।”
পাড়াবনের গাছ বিক্রি করে দেওয়ার যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি হলেন আলীকদম চৈক্ষ্য ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ছাহ্লা পাড়ার বাসিন্দা লংলে ম্রো। এলাকাবাসী আলীকদম সেনা জোন ও ইউএনও বরাবরে যে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন সেখানেও তাকে বিবাদী করা হয়েছে।
এ বিষয়ে লংলে ম্রো বলেন, “কয়েক বছর ধরে জুমচাষ ঠিকমত করা যাচ্ছিল না। টাকা-পয়সার প্রয়োজনে মূলত লাকড়ি হিসেবে বিক্রি করেছিলাম। বড় বড় গাছের বিক্রির কথা বলা হয়নি। বড় গাছ কাটার বিষয়ে আমার জানা নেই।”
অভিযান চালিয়ে ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন:
এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলন কমিটির বান্দরবান জেলা কমিটির সভাপতি জুয়ামলিয়ান আমলাইকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বনবিভাগকে দায়ী করে বলেন, “বনবিভাগের যোগসাজশ ছাড়া একটা পাড়াবন থেকে এভাবে গাছ কাটতে পারে না। কাটা সম্ভব নয়।”
“জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে বন উজাড়ের বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে। এই কাজে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।”
পাড়াবনের গাছ কাটার ব্যাপারে জানতে চাইলে লামা বনবিভাগের তৈন রেঞ্জের কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলাম বলেন, “তৈন রেঞ্জের দুইটা বিট রয়েছে। একটা হল তৈন সদর, আরেকটা হল পান বাজার বিট। জুরিসডিকশন হচ্ছে–তৈন মৌজা ও চৈক্ষ্য মৌজা মিলে ৫ হাজার ৭৮৪ একর বনভূমি। আগে আলীকদম মৌজার কিছু ছিল। এটা সরকারিভাবে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
“এখন আলীকদম-থানচি সড়কে যে ২৩ কিলো এলাকার কথা বলা হচ্ছে, সেটা আলীকদমেরই মাংগু মৌজা। সেটা এখান থেকে ১০ কিলোসহ ধরলে ৩৩ কিলোমিটার হয়। এত দূরে গিয়ে লোকবল সংকট নিয়ে কাজ করা একটা দূরূহ।”
তিনি বলেন, “ওখানে আমাদের কোনো বনবিভাগ নেই। আমাদের কার্যক্রমও নেই। শুধু বনবিভাগের প্রশাসনিক এলাকার মধ্যে পড়ে। তারপরও ইউএনওর সঙ্গে পরামর্শ করে আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব নিবৃত্ত করার চেষ্টা করব। অপরাধীকে ধরে হোক, বন আইন, ট্রানজিট রুট অনুযায়ী অথবা ভ্রাম্যমাণ অভিযান চালিয়ে হোক–আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।”
যোগাযোগ করা হলে লামা বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তফিজুর রহমান মঙ্গলবার বিকালে বলেন, “এ বিষয়ে মঙ্গলবার সকালে আমাকে অবগত করা হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। খুব দ্রুত অভিযান চালানো হবে।”
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনজুর আলম বলেন, এর মধ্যেই রেঞ্জ কর্র্মকর্তাকে তিনি আসতে বলেছেন। বনবভিাগ ও পুলিশ নিয়ে অভিযান চালানো হবে। তা না হলে আরও বাড়তে থাকবে।
ইউএনও মনজুর বলেন, “বনবিভাগ অবহিত করার পর খোঁজ নিয়ে দেখেছি, গাছ কাটা হচ্ছে ১৭ কিলো এলাকায়। কিন্তু নিয়ে যাচ্ছে ২৩ কিলো এলাকা দিয়ে। ১৭ কিলো এলাকার আগে সেনাবাহিনীর চেক পোস্ট আছে।
“সেখানে কাঠের গাড়ি পেলে ধরা হয়। পারমিট থাকলেও কাগজের সাথে ওই পরিমাণ মিল আছে কিনা চেক করে দেখা হয়। ধরা পড়ার ভয়ে তারা নদীর দিকে আরেক রুট ব্যবহার নিয়ে যায় হয়ত। এ ব্যপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
এ সড়কের ডিম পাহাড়ের ২৩ কিলো এলাকায় পৌঁছালে রাস্তার বাঁ পাশে হঠাৎ দেখা যায় গাড়ি চলাচলের একটি সরু পথ। অংশটি এমন ছোট বুনো লতায় ঢাকা; কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই যে এ পথ দিয়ে ট্রাকও চলাচলে করে।
কিন্তু সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ওই সরু পথ দিয়েই বেরিয়ে আসে ত্রিপলে ঢাকা একটি ট্রাক। সেই ত্রিপলের নিচে লুকিয়ে রাখা কাটা গাছ।
গাড়িতে দুজন শ্রমিক বসে ছিলেন। গাড়ির পেছনে ছিলেন আরেক শ্রমিক। ট্রাকের ছবি তুলতে দেখে সেই শ্রমিক বনের রাস্তা ধরে দৌড়ে পালিয়ে যান। আর গাড়িটিও চলে যায় সোজা আলীকদমের দিকে।
পরে যে পয়েন্ট থেকে ট্রাকটি বের হয়েছে; সে পথ ধরে ভেতর ঢুকে দেখা যায়, রাস্তাটি একেবারে নিচের দিকে চলে গেছে। ভয়ঙ্কর খাড়া সে পথ ধরে মিনিট ১৫ যাওয়ার পর হঠাৎ চোখে পড়ে একটু পরপর জমা করে রাখা বড় বড় কাটা গাছের স্তূপ।
কোনো কোনো গাছকে কেটে দুফালি করে রাখা হয়েছে। ‘রদ্দা’ (চার কোনা আকার) করেও রাখা হয়েছে কোনো কোনো গাছ। কোথাও পড়ে আছে কেটে নিয়ে যাওয়া গাছের গোড়া।
আরও নিচে গিয়ে দেখা যায়, পাথরে ঢাকা এক ঝিরির মুখে বড় বড় গাছের বিশাল স্তূপ। পড়ে আছে আরও অনেক লম্বা গাছ। সবচেয়ে বেশি গাছের স্তূপ সেখানে। চারপাশে তাকালে চোখে পড়ে কেটে ফেলে রাখা টুকরো গাছ আর গাছ।
ঝিরির কোনো কোনো অংশে পাহাড় ও পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে গাড়ি চলাচলের রাস্তা।
কাটা গাছের বিশাল স্তূপে চাপা পড়া ‘ব্যাঙঝিরি’ কয়েকটি পাড়ার খাবার পানির উৎস। আর এ ঝিরি ধরে দুই আড়াই কিলোমিটারজুড়ে পাড়াবনের বড় গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে।
‘পাড়াবন’ অনেকের কাছে ‘পাড়াবাম’ ও ‘রিজার্ভ বন’ নামেও পরিচিত। পাহাড়িদের কোনো একটি পাড়ায় তার আশপাশে ‘অ-শ্রেণিভুক্ত’ বনাঞ্চলে একটি নির্দিষ্ট বড় এলাকা নিয়ে এ বনভূমি সংরক্ষণ করে রাখা হয়।
পাড়াবাসীর দ্বারা পরিচালিত এসব বনের প্রাকৃতিক সম্পদগুলো সামাজিকভাবে ব্যবহার করা হয়। নিজেদের প্রয়োজনে তারা বনের সম্পদ ব্যবহার করেন। মৌজা প্রধান হেডম্যান ও গ্রামপ্রধান কারবারিরা এটাকে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন।
তবে সামাজিক মালিকানা হলেও পাড়াবনের বড় গাছ কাটার জন্য বনবিভাগের অনুমতি লাগে। অনুমতি ছাড়া বড় গাছ কাটার নিয়ম নেই।
বনে শ্রমিকদের ঘর:
সোমবার সরেজমিনে গিয়ে এই ঝিরির নিচে দুই-তিনশ গজ দূরে তৈরি করা দুটো ঝুপড়ি ঘর পাওয়া যায়। একটি ঘরের ভেতর প্রায় নয়-দশজন থাকার মত জায়গা। ঘরের ভেতর দুটো গাছ কাটার মেশিনও রয়েছে।
রান্না করে খাওয়ার জন্য ঝিরি থেকে পাইপ দিয়ে পানির লাইনও টানা হয়েছে। পানি টানার মোটর চালাতে আছে ‘সোলার প্যানেল’। বাইরে শ্রমিকদের কাপড়-চোপড় শুকানো হচ্ছে।
দুজন শ্রমিক তখনও রান্নার কাজে ব্যস্ত। তাদের একজন মো. ইসমাইল নিজেকে মাঝি (শ্রমিকদের দলনেতা) হিসেবে পরিচয় দিলেন।
সাংবাদিকদের তিনি বললেন, তার বাড়ি কক্সাবাজার জেলার চকরিয়া এলাকায়। আলীকদমের আবু হান ইসমাইল নামে একজন গাছের সওদাগর তিন-চার মাস আগে তাকে নিয়ে এসেছেন। মূলত আবু হান ইসমাইলের নির্দেশেই গাছগুলো কাটা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সাত-আটজন শ্রমিক রয়েছে। দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মজুরিতে এই গাছ কাটা হচ্ছে। এখানে বেশির ভাগ লালি গাছ ও তুলা গাছ রয়েছে। দামি গাছের মধ্যে একটা মাত্র বৈলাম গাছ পাওয়া গেছে।
ইসমাইল বলেন, “আমরা কাজ করে খাওয়া মানুষ। চকরিয়া এলাকায় একদিন কাজ পাওয়া গেলে আরেকদিন পাওয়া যায় না। কয়েক দিন বসে থাকতে হয়। তাই যে কোনো জায়গায় কাজ পেলে সেখানে গিয়ে কাজ করি।
“একটানা কয়েক মাস কাজ পাওয়ার আশায় এখানে আসছি। আসছি বেশি দিন হয়নি। এর আগে এখানে কারা কাজ করে গেছে আমার জানা নেই।”
বাকি শ্রমিকরা কোথায় জানতে চাইলে ইসমাইল মাঝি বলেন, “আপাতত গাছ কাটা শেষ। এখন যে কোনো সময় বৃষ্টি হতে পারে। আর গাছ কাটা হচ্ছে না। শ্রমিকরা যে যার এলাকায় চলে গেছে। এখন ট্রাকে করে গাছ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। দিনে একবারই টানা হয়। বেশি হলে দুইবারের বেশি গাছ টানা যায় না।”
ঝিরির পাশ দিয়ে পাহাড় কেটে আরও নতুন রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে ইসমাইল মাঝি বলেন, “এটা থানচির আরেক গ্রুপের কাজ। আমরা কাটছি না। ওইদিকে খুব বেশি আর গাছ নাই। খরচ উঠবে না দেখে এতটুকুতে রাস্তা তৈরির কাজ বন্ধ করে দিয়েছে শুনছি।”
শামসুল আলম নামে আরেজন শ্রমিক বললেন, তার বাড়িও চকরিয়ায়। এখানে গাছ কাটার কাজে এসেছেন ১৮ দিন আগে। দৈনিক ৪৫০ টাকার মজুরিতে রান্না ও গাছ নামানোর কাজে নিয়োজিত রয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, আলীকদমে তার একজন মামা রয়েছে। তিনি বন থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে বিক্রি করেন। গাছের সওদাগর আবু হান ইসমাইলের বাড়ির পাশে থাকেন তার মামা। তিনিই খবর দিয়ে তাকে নিয়ে আসেন।
তবে ইসমাইল মাঝির গাছ কাটা শেষ- এমন দাবি ঠিক নয় বলেই মনে হয়েছে পরিস্থিতি দেখে। কারণ ঝিরির আশপাশে কাটা গাছের অবস্থা দেখে বোঝা যায়, অনেক গাছের পাতা তখনও শুকায়নি। গাছের গোড়ার মাটি তখনো ভেজা। হয়তো আগের দিন বা সকালেই গাছগুলো কাটা হয়েছে।
‘লাকড়ি সংগ্রহ’ করতে গিয়ে জড়িয়ে গেছেন!:
গাছ কাটার ব্যাপারে আবু হান ইসমাইলকে ফোন দেওয়া হলে তিনি বলেন, “আমি মূলত আলীকদমের পান বাজার এলাকায় পানের ব্যবসা করি। পানের দোকান রয়েছে। গাছের ব্যবসায় নতুন। মাত্র তিন মাস হয়েছে ওখান থেকে শুধু লাকড়ি সংগ্রহ করছি।”
তিনি দাবি করেন, “লংলে ম্রো নামে একজনের কাছ থেকে লাকড়ি হিসেবে ব্যবহারের জন্য কিনে নিয়েছিলাম। কোনো গাছ কাটার জন্য নয়। সে বলছিল, জুমের জন্য পোড়ানোর পর গাছগুলো এমনি পড়ে থাকবে। সেগুলো কিনে লাকড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে পারব।”
কিন্তু ঝিরিপথের দুই-আড়াই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাড়াবনের গাছগুলো কাটা হয়েছে। গাছ টানার জন্য পাহাড় ও পাথর কেটে রাস্তাও তৈরি করা হয়েছে। সেখানে তার নাম বারবার আসছে। শ্রমিকরাও গাছ কাটার কথা স্বীকার করেছেন।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে অভিযোগ অস্বীকার করে আবু হান ইসমাইল বলেন, “পাহাড় কেটে যারা রাস্তা তৈরি করেছে, তারাই বড় গাছ কেটেছে। তারা থানচি এলাকার গাছ ব্যবসায়ী। তারা কারা আমারও জানা নেই।”
তিনি বলেন, “শুধু লাকড়ি সংগ্রহ করতে গিয়ে শেষের দিকে এসে আমি জড়িয়ে গেছি। এটা আমার বড় ভুল হয়েছে। সেখানে এত সমস্যা আছে জানলে আমি জড়াতাম না। আমি লাকড়িগুলো আলীকদমের ইটভাটা ও তামাকের চুল্লিতে বিক্রি করি।
“এরপর থেকে এই ব্যবসায় আর জড়াব না। আজকে (সোমবার) শ্রমিকদের সেখান থেকে নামিয়ে এনেছি।”
কিন্তু স্থানীয়দের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মঙ্গলবার সারাদিনও অভিযানের ভয়ে ট্রাকে করে গাছ সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
‘ব্যাঙঝিরির’ নিচের পামিয়া পাড়ার বাসিন্দা লাইরু ম্রো বলেন, “ঝিরির আশপাশে কোথাও কোথাও মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। সাংবাদিক আসার খবর শুনে শ্রমিকদের কেউ জানিয়ে দিয়েছে হয়ত। বাকি শ্রমিকরা জঙ্গলে কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারে।
“সাংবাদিকরা চলে যাওয়ার পর সারাদিন আরও গাছ টানছে। এমনকি অভিযানের ভয়ে রাতেও ট্রাকে করে গাছগুলো নিয়ে গেছে। মাটি কাটার যন্ত্র একটা এক্সক্যাভেটরও ছিল শুনেছি। সেটাও জঙ্গলে লুকিয়ে রাখতে পারে তারা।”
অভিযোগ-বাধায়ও থামেনি বন উজাড়:
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০২৪ সালের শেষ থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত এই ‘পাড়াবনে’ ঢুকে বড় বড় গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন সময় তারা কয়েক দফা বাধা দিয়েও থামাতে পারেননি গাছ কাটা।
কেবল বর্ষাকালের কয়েক মাস ছাড়া প্রতিনিয়ত নির্বিঘ্নে গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এমনকি গাছ টানতে ঝিরির উপর ট্রাক চলাচল করায় এবং গাছের স্তূপ করার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকটি পাড়ার খাবার পানির উৎসও।
পাড়াবাসীর ভাষ্য, এ বছর জানুয়ারির দিকে প্রথমে আলীকদম সেনা জোন ও পরে উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
লাইরু ম্রো বলেন, “২০২৪ সালে শেষের দিকে যখন গাছ কাটা শুরু করে তখন আমরা বাধা দিয়েছিলাম। কোনো কাজ হয়নি। এ বছর শুরুর দিকে একইভাবে বাধা দিতে গিয়েছিলাম। তারা একজন ম্রোর কাছ থেকে বাগান কেনার কথা বলে। অথচ এটা একটা সংরক্ষণ করে রাখা পাড়াবন।”
তিনি বলেন, “উপায় না পেয়ে এ বছর জানুয়ারি দিকে প্রথমে আলীকদম সেনা জোন এবং পরে ইউএনও কার্যালয়ে অভিযোগ দিয়েছিলাম।
“সেনা জোন থেকে তখন আমাদেরকে বলা হয়েছিল, একমাস পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর ইউএনও কার্যালয় থেকে পুলিশ এবং বনবিভাগের সহযোগিতা নিতে পরামর্শ দিয়েছিল।”
কিন্তু গাছ কাটা আর বন্ধ হয়নি। পরে উপায় না পেয়ে তারা গাছ কাটার ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেন বলে জানান তিনি।
আগের মত পানি পাওয়া যাচ্ছে না:
একসময় সেখানকার ওই ঝিরিতে ছোট ছোট প্রচুর ব্যাঙ ও ব্যাঙাচি পাওয়া যেত। এই কারণে স্থানীয়রা নাম দিয়েছে ‘ব্যাঙঝিরি’।
আলীকদমের চৈক্ষ্যং ইউনিয়নে চারটি পাড়া- পামিয়া পাড়া, তুংতুই পাড়া, নামসাক পাড়া ও খাকই পাড়া এবং লামা উপজেলার রূপসীপাড়া ইউনিয়নের দুটি পাড়া কুইরিং ও সাংক্লা পাড়া এই ঝিরির উপর নির্ভরশীল।
ঝিরির উৎসমুখ ও তার আশপাশে গাছ কেটে ফেলায় এই পাড়াগুলো একসময় পানি সংকটে পড়তে শুরু করেছে।
পানি সংকটের কথা তুলে ধরে পামিয়া পাড়ার আরেক বাসিন্দা মেনচং ম্রো বলেন, “গাছ কাটার আগে ঝিরিতে ভালভাবে পানি পাওয়া যেত। এখন আগের মত আর পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
“পাড়াবন থেকে এভাবে গাছ কাটা বন্ধ করার কেউ নেই। আমরা গিয়ে কয়েকবার বাধা দিয়েছি। কোনোভাবে বন্ধ করা যায়নি।”
স্থানীয় বাসিন্দা মেনরাও ম্রো বলেন, “এটা সংরক্ষিত পাড়াবন। তবে আয়তন কত পরিমাণ আছে সঠিকভাবে কারও জানা নেই। ধারণা করা হচ্ছে ৫০ একরের মত হবে।
“এখানে বন্য শুকর, হরিণ, বন মোরগ, বানর ছিল। গত বছর এই এলাকায় দুটো ভালুকও দেখা গেছে। গাছ কেটে ফেলে বন ধ্বংস হওয়ায় এগুলো আর কিছুই থাকবে না।”
পাড়াবনের গাছ বিক্রি করে দেওয়ার যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি হলেন আলীকদম চৈক্ষ্য ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ছাহ্লা পাড়ার বাসিন্দা লংলে ম্রো। এলাকাবাসী আলীকদম সেনা জোন ও ইউএনও বরাবরে যে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন সেখানেও তাকে বিবাদী করা হয়েছে।
এ বিষয়ে লংলে ম্রো বলেন, “কয়েক বছর ধরে জুমচাষ ঠিকমত করা যাচ্ছিল না। টাকা-পয়সার প্রয়োজনে মূলত লাকড়ি হিসেবে বিক্রি করেছিলাম। বড় বড় গাছের বিক্রির কথা বলা হয়নি। বড় গাছ কাটার বিষয়ে আমার জানা নেই।”
অভিযান চালিয়ে ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন:
এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলন কমিটির বান্দরবান জেলা কমিটির সভাপতি জুয়ামলিয়ান আমলাইকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বনবিভাগকে দায়ী করে বলেন, “বনবিভাগের যোগসাজশ ছাড়া একটা পাড়াবন থেকে এভাবে গাছ কাটতে পারে না। কাটা সম্ভব নয়।”
“জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে বন উজাড়ের বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে। এই কাজে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।”
পাড়াবনের গাছ কাটার ব্যাপারে জানতে চাইলে লামা বনবিভাগের তৈন রেঞ্জের কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলাম বলেন, “তৈন রেঞ্জের দুইটা বিট রয়েছে। একটা হল তৈন সদর, আরেকটা হল পান বাজার বিট। জুরিসডিকশন হচ্ছে–তৈন মৌজা ও চৈক্ষ্য মৌজা মিলে ৫ হাজার ৭৮৪ একর বনভূমি। আগে আলীকদম মৌজার কিছু ছিল। এটা সরকারিভাবে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
“এখন আলীকদম-থানচি সড়কে যে ২৩ কিলো এলাকার কথা বলা হচ্ছে, সেটা আলীকদমেরই মাংগু মৌজা। সেটা এখান থেকে ১০ কিলোসহ ধরলে ৩৩ কিলোমিটার হয়। এত দূরে গিয়ে লোকবল সংকট নিয়ে কাজ করা একটা দূরূহ।”
তিনি বলেন, “ওখানে আমাদের কোনো বনবিভাগ নেই। আমাদের কার্যক্রমও নেই। শুধু বনবিভাগের প্রশাসনিক এলাকার মধ্যে পড়ে। তারপরও ইউএনওর সঙ্গে পরামর্শ করে আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব নিবৃত্ত করার চেষ্টা করব। অপরাধীকে ধরে হোক, বন আইন, ট্রানজিট রুট অনুযায়ী অথবা ভ্রাম্যমাণ অভিযান চালিয়ে হোক–আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।”
যোগাযোগ করা হলে লামা বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তফিজুর রহমান মঙ্গলবার বিকালে বলেন, “এ বিষয়ে মঙ্গলবার সকালে আমাকে অবগত করা হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। খুব দ্রুত অভিযান চালানো হবে।”
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনজুর আলম বলেন, এর মধ্যেই রেঞ্জ কর্র্মকর্তাকে তিনি আসতে বলেছেন। বনবভিাগ ও পুলিশ নিয়ে অভিযান চালানো হবে। তা না হলে আরও বাড়তে থাকবে।
ইউএনও মনজুর বলেন, “বনবিভাগ অবহিত করার পর খোঁজ নিয়ে দেখেছি, গাছ কাটা হচ্ছে ১৭ কিলো এলাকায়। কিন্তু নিয়ে যাচ্ছে ২৩ কিলো এলাকা দিয়ে। ১৭ কিলো এলাকার আগে সেনাবাহিনীর চেক পোস্ট আছে।
“সেখানে কাঠের গাড়ি পেলে ধরা হয়। পারমিট থাকলেও কাগজের সাথে ওই পরিমাণ মিল আছে কিনা চেক করে দেখা হয়। ধরা পড়ার ভয়ে তারা নদীর দিকে আরেক রুট ব্যবহার নিয়ে যায় হয়ত। এ ব্যপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”