উত্তাল সমুদ্রে রোহিঙ্গাদের ‘মরণপণ’ যাত্রা: ২০২৫ সালে রেকর্ড প্রাণহানি

আপলোড সময় : ২২-০৪-২০২৬ ১১:৫৮:৩০ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২২-০৪-২০২৬ ১২:২৩:৩৬ অপরাহ্ন
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ২০২৫ সাল ছিল সমুদ্রপথে রোহিঙ্গাদের জন্য সবচেয়ে ‘প্রাণঘাতী’ বছরগুলোর একটি।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা-ইউএনএইচসিআর বলছে, দেশান্তরের চেষ্টায় গত বছর আন্দামান ও বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছে অথবা নিখোঁজ হয়েছেন।

তারপরও কেন রোহিঙ্গারা উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার মত দেশগুলোতে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছে, তা খোঁজার চেষ্টা করছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, খাদ্য সহায়তায় ঘাটতি এবং ভবিষ্যৎ ঘিরে ক্রমবর্ধমান হতাশা হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর উদ্দেশ্যে ‘ভাগ্যের জুয়ায়’ ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ উপকূল থেকে সুমদ্রযাত্রা করতে গিয়ে মরতে মরতে বেঁচে ফেরা এবং নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন রোহিঙ্গার কথা মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে রয়টার্স। তেমনই একজন রাহিলা বেগম।

চলতি মাসের শুরুতে আন্দামান সাগরে রোহিঙ্গাবোঝাই ট্রলারডুবির ঘটনায় বেঁচে ফেরাদের একজন তিনি। ওই ঘটনায় রাহিলা উত্তাল সাগরে ডুবে যাওয়া ট্রলারের একটি কাঠ ধরে অন্তত দুই দিন ভেসে ছিলেন। ওই দুর্ঘটনায় অন্তত ২৫০ জনের সলিল সমাধি ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রয়টার্স বলছে, রাহিলা সেই হাজার হাজার রোহিঙ্গাদের একজন, যারা প্রতি বছর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শরণার্থী শিবিরগুলোর ‘মানবেতর জীবন’ থেকে বাঁচতে ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার মত দেশগুলোতে যাওয়ার জন্য জরাজীর্ণ নৌকায় করে সমুদ্র পাড়ি দেয়।

ক্ষুধা বা সমুদ্রপথে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। আন্তর্জাতিক সাহায্য কমে যাওয়ায় খাদ্য সহায়তার পরিমাণ হ্রাস পাওয়াই মূলত এই ‘বিপজ্জনক যাত্রার’ মূল কারণ।

সম্প্রতি শরণার্থী শিবিরে পলিথিন ও ত্রিপলের ঝুপড়িতে বসে কম্বল জড়িয়ে তীব্র জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে ২৬ বছর বয়সী রাহিলা রয়টার্সকে বলেন, “আমি কখনো ভাবিনি যে বেঁচে ফিরব। মনে হচ্ছিল এটাই আমার জীবনের শেষ।”

রাহিলার শরীর ও হাত সমুদ্রের লোনা পানির সঙ্গে মিশে যাওয়া ইঞ্জিনের গরম তেল লেগে পুড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে।

তিনি বলছেন, আরো অনেক রোহিঙ্গার মত তিনিও ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিলেন। চার বছর আগে বিয়ে হওয়ার পর তার অবস্থা আরও খারাপ হয়।

“সন্তান না হওয়ায় আমাকে মারধর করা হত। আমি জানতাম আমাকে পালাতে হবে। এখানে আমার জন্য কোনো জীবন ছিল না।”

গত সপ্তাহে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাসহ প্রায় ৩০০ জন আরোহী নিয়ে তাদের ট্রলারটি মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে আন্দামান সাগরে ডুবে যায়। রাহিলাকে একটি বাংলাদেশি তেলবাহী জাহাজ উদ্ধার করে কোস্টগার্ডের হাতে তুলে দেয়।

বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় এখন ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বসবাস। তাদের অধিকাংশই মিয়ানমারের সামরিক দমন-পীড়ন ও সহিংসতার শিকার হয়ে পালিয়ে এসেছেন। অনেকের জন্ম হয়েছে এ দেশের শরণার্থী শিবিরে।

রয়টার্স লিখেছে, বছরের পর বছর বাংলাদেশে আটকা পড়ে থাকা এই মানুষগুলোর কাজের কোনো অধিকার নেই, শিক্ষার সুযোগ সীমিত। এখন খাদ্য সহায়তাও কমে আসছে। ফলে বাংলাদেশে যেমন তারা ভবিষ্যৎ দেখছেন না, তেমনি মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিও নিতে পারছেন না।

ইউএনএইচসিআর-এর কর্মকর্তা অ্যাস্ট্রিড ক্যাসটেলিন বলেন, “রোহিঙ্গা জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ এবং তারা একটু ভালো জীবনের আশা করে। কিন্তু সেই আশা ক্রমে হতাশায় রূপ নিচ্ছে। এ কারণেই যুবকরা এবং পরিবারগুলো বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বাংলাদেশি কর্মকর্তা বলেন, পাচারকারী চক্রগুলোকে ঠেকাতে কর্তৃপক্ষ উপকূলীয় এলাকায় টহল এবং রোহিঙ্গা শিবিরে নজরদারি বাড়িয়েছে। তবে মানুষের চরম হতাশার কারণে ‘আইন প্রয়োগ’ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

চলতি মাসে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে প্রতিটি পরিবারের আয়ের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে রেশন বণ্টন শুরু করেছে। সবচেয়ে অসহায়দের জন্য জনপ্রতি মাসিক সহায়তা ১২ মার্কিন ডলার (১৪৭৩ টাকা) এবং অন্যদের জন্য মাত্র ৭ ডলার (৮৬০ টাকা) নির্ধারণ করা হয়েছে।

রোহিঙ্গা শিবিরে বাস কার চার সন্তানের জনক মোহাম্মদ রফিক (৫০) বলেন, “আমার ১৮ বছরের এক ছেলে আছে বলে রেশন ১২ ডলার থেকে কমিয়ে ৭ ডলার করা হয়েছে। কিন্তু সে কি কিছু আয় করে? এই টাকায় শুধু চাল আর তেল কেনা যায়, মাছ-মাংস জোটে না। আমরা অমানবিক পরিস্থিতিতে বাস করছি। আমার সন্তানরা যদি একদিন সমুদ্রপথে চলে যায়, আমি অবাক হব না।”

রয়টার্স লিখেছে, রোহিঙ্গাদের এই ‘মরিয়া’ অবস্থার সুযোগ নেয় মানব পাচারকারীরা, যাদের অনেকেই আবার রোহিঙ্গা। ফয়সাল ছদ্মনামের এক ২৪ বছর বয়সী পাচারকারী জানান, আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়া ট্রলারটিতে তিনি ২০ জনকে পাঠিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ৩ জন নারী ও ২ জন শিশু ছিল। তাদের কেউ বেঁচে নেই।

ফয়সাল বলেন, “ডুবে যাওয়া লোকগুলোর পরিবার খোঁজ জানতে বারবার ফোন করে। মাঝে মাঝে আমি ফোন বন্ধ করে রাখি।”

ফয়সাল নিজে ২০১৮ সালে মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন, পরে কক্সবাজারের ক্যাম্পে ফিরে এই পাচারের কারবারে নামেন। ২০২০ সালে মানবপাচারের অভিযোগে এক বছর জেল খাটলেও ছাড়া পাওয়ার পর তিনি আবারও এ কাজে লিপ্ত হন।

ফয়সাল বলেন, সাধারণত শীতকালে সমুদ্র শান্ত থাকলে ‘যাত্রা’ বাড়ে। তবে এখন মানুষ এতটাই ‘মরিয়া’ যে, তারা যে কোনো সময় ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।

“তারা আমাদের কাছে এসে বাঁচার পথ খোঁজে। ঝুঁকি আছে জেনেও তারা সমুদ্রযাত্রা করে। তাদের কেউ গন্তব্যে পৌঁছায়, কেউ গ্রেপ্তার হয়, আর কেউ মারা যায়।”

তথ্যসূত্র: রয়টার্স

সম্পাদকীয় :

লাইসেন্স নং: TRAD/DNCC/013106/2024 বার্তা বিভাগ: [email protected] অফিস: [email protected]

অফিস :

যোগাযোগ: মিরপুর, শেওড়াপাড়া হটলাইন: 09638001009 চাকুরী: [email protected]