মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের অতীতে হারিয়ে যাওয়া কয়েকটি পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, কয়েক দশক আগে দুর্ঘটনায় নিখোঁজ হওয়া অন্তত ছয়টি মার্কিন পারমাণবিক ওয়ারহেডের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এসব অস্ত্রের অবস্থান অজানা থাকায় সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা আবার সামনে এসেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মিরর–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র সম্পর্কিত একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন সামরিক পরিভাষায় এ ধরনের দুর্ঘটনাকে বলা হয় ‘ব্রোকেন অ্যারো’। এর অর্থ হলো এমন পরিস্থিতি, যেখানে দুর্ঘটনার কারণে পারমাণবিক অস্ত্র হারিয়ে যায় অথবা সামরিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
উপলব্ধ নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের মোট ৩২টি ‘ব্রোকেন অ্যারো’ ঘটনার রেকর্ড রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ছয়টি ঘটনায় পারমাণবিক ওয়ারহেড এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। মার্কিন কর্তৃপক্ষের যুক্তি হলো, যদি তাদের পক্ষেই এসব অস্ত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়, তবে অন্য কোনো পক্ষের পক্ষেও সেগুলো খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না।
এ ধরনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ঘটে ১৯৫৮ সালে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের টাইবি দ্বীপের আকাশসীমায় দুটি মার্কিন সামরিক বিমানের সংঘর্ষ হয়। দুর্ঘটনার সময় একটিবি-৪৭ স্ট্রাটোজেট বোমারু বিমান একটি মার্ক-১৫ পারমাণবিক বোমা বহন করছিল। সংঘর্ষের পর বিমানটি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সম্ভাব্য বিস্ফোরণের ঝুঁকি এড়াতে পাইলট জর্জিয়ার উপকূলবর্তী ওয়াসাউ সাউন্ড এলাকায় সমুদ্রে বোমাটি ফেলে দেন।
প্রায় ৭ হাজার ৬০০ পাউন্ড ওজনের এই হাইড্রোজেন বোমার বিস্ফোরণ ক্ষমতা প্রায় ৩ দশমিক ৮ মেগাটন বলে উল্লেখ করা হয়। তুলনামূলকভাবে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমাতে ব্যবহৃত পারমাণবিক বোমার তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল বলে বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেন। দুর্ঘটনার পর একাধিকবার অনুসন্ধান চালানো হলেও বোমাটি আজ পর্যন্ত উদ্ধার করা যায়নি।
প্রাথমিকভাবে মার্কিন বিমানবাহিনী জানিয়েছিল, বোমাটির প্লুটোনিয়াম ওয়ারহেড উড্ডয়নের আগে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত কংগ্রেসনাল নথিতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে টাইবি দ্বীপের কাছে হারিয়ে যাওয়া মার্ক-১৫ বোমাটি আসলে সম্পূর্ণ অবস্থাতেই ছিল।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ১৯৬৬ সালে, যখন দুটি মার্কিন সামরিক বিমানের সংঘর্ষের পর একটি থার্মোনিউক্লিয়ার বোমা ভূমধ্যসাগরে হারিয়ে যায় এবং এর ওয়ারহেড আজও নিখোঁজ রয়েছে।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও ইসরাইলকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, অতীতে হারিয়ে যাওয়া পারমাণবিক অস্ত্রগুলো নিয়ে উদ্বেগ নতুন করে সামনে আসার এটিও একটি কারণ।
পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক জেফ্রি লুইস বলেছেন, সামরিক হামলা কোনো দেশের শাসনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে না পারলে সংশ্লিষ্ট দেশ ভবিষ্যতে আবারও পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠনের চেষ্টা করতে পারে। তার মতে, প্রযুক্তিটি পুরোনো হলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই অনেক সময় পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।