টানা তিন বছর উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজার থেকে সরিয়ে দেওয়ার (ডিলিস্টিং) আইনি বিধান থাকলেও তা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা কাটছে না। অতীতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনাগ্রহ এবং আইনি জটিলতায় অকার্যকর কোম্পানিগুলো মূল বোর্ডে রয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাজারের শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফেরাতে এসব 'জাঙ্ক' বা পচা শেয়ারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি তুলেছেন বাজার বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা। তারা বলছেন, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করে একটি সুনির্দিষ্ট ‘এক্সিট মেকানিজম’ বা বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সুযোগ তৈরি করে এসব প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত তালিকাচ্যুত করা জরুরি।
দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্যমতে, বর্তমানে ৩৫৯টি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১১টিই ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। কারখানা বন্ধ থাকা, সঞ্চিত লোকসান পরিশোধিত মূলধনের চেয়ে বেশি হওয়া, নিয়মিত এজিএম না করা এবং লভ্যাংশ প্রদানে ব্যর্থতার কারণে এসব কোম্পানিকে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডিএসইর পরিচালক মো. সাজেদুল ইসলাম জানান, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই ডিলিস্টিং প্রক্রিয়ায় সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফ্যামিলিটেক্সের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে মাত্র ৪.০২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। এমতাবস্থায় হুট করে ডিলিস্ট করলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন। তবে অতীতে ডিলিস্ট হওয়া রহিম ফুড করপোরেশনের আবার মূল বোর্ডে ফিরে আসার নজিরও রয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, অকার্যকর কোম্পানিগুলোকে বছরের পর বছর মূল বোর্ডে টিকিয়ে রাখায় বাজারে তিনটি বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। প্রথমত, এসব শেয়ার নিয়ে কারসাজি বা ‘পাম্প-অ্যান্ড-ডাম্প’ প্রক্রিয়ায় কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো সহজ হয়। যেমন, লোকসানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শ্যামপুর সুগার মিলসের শেয়ারদর কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই গত এক মাসে ২৭ শতাংশ বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, সুশাসনহীন কোম্পানির আধিক্য বাজারের সামগ্রিক মান কমিয়ে দেয়। তৃতীয়ত, এটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা পাঠায়, যা পোর্টফোলিও বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম মনে করেন, ডিলিস্টিং একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য বাধ্যতামূলক বাইব্যাক বা শেয়ার পুনারায় কিনে নেওয়ার বিধান রাখা যেতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটিও বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছে। আনিসুজ্জামান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কমিটি সুপারিশ করেছে যে, দীর্ঘদিন বন্ধ ও লভ্যাংশহীন কোম্পানির জন্য আলাদা ‘আর’ (Restricted) ক্যাটাগরি করা হোক। এতে এসব শেয়ার পৃথক প্ল্যাটফর্মে লেনদেন হবে, যা কারসাজি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নের জন্য অকার্যকর প্রতিষ্ঠানকে লেনদেন মঞ্চ থেকে সরানো এখন সময়ের দাবি। নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, উদ্যোক্তাদের দায়বদ্ধতা বাড়ানো এবং শেয়ার বিক্রিতে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।