বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ির কবলে শবে বরাত____________________
আল্লাহ তাআলা তাঁর চিরন্তন ধারা অনুযায়ী এক স্থানকে অন্য স্থানের উপর, নির্দিষ্ট সময়কে অন্য সময়ের উপর শ্রেষ্টত্ব ও মাহাত্ব্য দান করেছেন। মাহে রমযান সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ট ও সুমহান। জুমার দিন অন্য দিনের তুলনায় মর্যাদাবান। অন্যান্য স্থানের উপর মক্কা-মদীনার অধিক সম্মান। অনুরূপ শবে কদরের পরে অন্যান্য রজনীর চেয়ে শবে বরাতের স্থান।
আজকাল শবে বরাত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। কেউ এর গুরুত্ব বর্ণনা করছেন। আবার কেউ এর অস্তিত্বকেই পুরোদমে অস্বীকার করছেন। আবার কেউ আমলের নামে এমন সব কাজও করছেন, যা কুরআন-হাদীসের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
শবে বরাতকে কেন্দ্র করে একশ্রেণীর মানুষ বাড়াবাড়িতে লিপ্ত এবং রসম-রেওয়াজের অনুসরণে তৃপ্ত। আবার এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে ছাড়াছাড়ির প্রবণতা পরিলক্ষিত। তাদের দাবি হল, ‘ইসলামে শবে বরাতের কোন ধারণা নেই। এ ব্যাপারে যত বর্ণনা আছে সব জাল বা দুর্বল।’ তারা এসব বক্তব্যসম্বলিত ছোট ছোট পুস্তিকা ও লিফলেট তৈরি করে মানুষের মধ্যে বিলি করছে।
বাস্তব কথা হল, বাড়াবাড়ির পথটিও সঠিক নয় এবং ছাড়াছাড়ির মতটিও শুদ্ধ নয়। কেননা শরীয়তে ছাড়াছাড়ির যেমন অবকাশ নেই, তেমনি বাড়াবাড়িরও কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই। ইসলাম ভারসাম্যতার দ্বীন এবং এর সকল শিক্ষাই প্রান্তিকতা মুক্ত সরল পথের নির্দেশনা দেয়।
কাজেই কুরআন-সুন্নাহর সঠিক বুঝের অভাবে কেউ যেন কোন আমল ছেড়ে না দেন কিংবা আমলের নামে বিদআতে লিপ্ত না হন সেদিকে খেয়াল রাখাও জরুরী। কারণ আল্লাহ পাক আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য। তাই ইবাদতে যাতে কম না হয় কিংবা ইবাদতে যাতে শরীয়ত বিরোধী কিছু না হয় এজন্য আমাদেরকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
শবে বরাতের ব্যাপারে সঠিক ও ভারসাম্যতাপূর্ণ অবস্থান হল, এ রাতের ফযীলত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। সম্মিলিত কোন রূপ না দিয়ে এবং এই রাত উদযাপনের বিশেষ কোন পন্থা উদ্ভাবন না করে বেশি ইবাদত করাও নির্ভরযোগ্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এই রাতকে অন্য সব সাধারণ রাতের মত মনে করা এবং এ রাতের ফযীলতের ব্যাপারে যত হাদীস এসেছে তার সবগুলো ‘জাল বা দুর্বল’ মনে করা যেমন ভুল, তেমনি এ রাতকে শবে কদরের মত বা তার চেয়েও বেশি ফযীলতপূর্ণ মনে করাও একটি ভিত্তিহীন ধারণা।
শবে বরাতের প্রামাণিকতা
মুসলিম উম্মাহর মাঝে এ রাতটির গুরুত ও মহত্ত্ব না আজকের। না বছর কয়েক পূর্বের, বরং ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে যুগ যুগ ধরেই এর ধারা চলে আসছে।
এ রাতের ফযীলত ও গুরুত্ব সম্পর্কে দশজন সাহাবী থেকে হাদীস বর্ণিত, যা সমষ্টিগত দিক থেকে সন্দেহাতীতভাবে সহীহ এর মানে উন্নীত। মুহাদ্দিসীনে কেরাম স্বীয় হাদীসগ্রন্থসমূহে বিভিন্ন শিরোনামে তা লিপিবদ্ধ করেছেন। তাদের কেউ কেউ এগুলো থেকে প্রমাণও গ্রহণ করেছেন। ফুকাহাগণ এ বিষয়ে ফিকহের কিতাবসমূহে মুবাহ-মুস্তাহাবের বর্ণনা দিয়েছেন। এছাড়া অনেকে বিক্ষিপ্ত লেখনী ও বক্তব্যের মাধ্যমে এ রাতের করণীয় ও বর্জনীয়সমূহ তুলে ধরেছেন।
আর এ রাতকে কেন্দ্র করে প্রস্তুত করা হয়েছে গবেষণালদ্ধ অনেক প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও ছোট-বড় অসংখ্য গ্রন্থ। সুতরাং শবে বরাতের ফযীলত ভিত্তিহীন বলা অজ্ঞতা বা ভ্রষ্টতা ছাড়া কিছুই নয়। নিম্নে এ সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা হল।
হযরত মুআয ইবনে জাবাল রা. বর্ণনা করেন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
يَطْلُعُ اللهُ إِلَى خَلْقِهِ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ
আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে (শবে বরাতে) সৃষ্টিকুলের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত সবাইকে মাফ করে দেন। (সহীহ ইবনে হিব্বান হা. ৫৬৬৫)
অন্য হাদীসে আয়েশা রা. বলেন,
فَقَدْتُ رَسُولَ اللهِ لَيْلَةً فَخَرَجْتُ، فَإذَا هُوَ بِالبَقِيعِ، فَقَالَ: أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ؟ قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ! إِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ، فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا، فَيَغْفِرُ لأَكْثَر مِنْ عَدَدِ شَعْرِ غَنَمِ كَلْبٍ
এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ কে বিছানায় না পেয়ে খুঁজতে বের হয়ে জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে তাঁকে পেলাম। তখন রাসূল ইরশাদ করলেন- আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং কাল্ব গোত্রের ছাগলসমূহের চেয়েও অধিক সংখ্যক গুনাহগারকে ক্ষমা করে দেন। (মুসনাদে আহমদ ২৬০১৮ ও তিরমিযী ৭৩৯)
সূত্রদ্বয়ে যদিও বিচ্ছিন্নতার কারণে স্বল্প দুর্বলতা রয়েছে, তবে হাদীসটির মূল বক্তব্য সম্বলিত আরো আটজন সাহাবায়ে কেরাম থেকে বর্ণনা পাওয়া যায়। তাঁরা হলেন হযরত আবু বকর, আবু সালাবা, আব্দুল্লাহ ইবনে আমর, আবু মুসা আশআরী, আবু হুরায়রা, আউফ ইবনে মালিক, উসমান ইবনে আবীল-আস ও আবু দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহুম প্রমূখ। (প্রথম থেকে অষ্টম পর্যন্ত হাদীসসমূহ জানতে দেখুন- শায়খ আলবানীর “সিলসিলাতুল আহাদীসিস-সহীহা” ৩/১৩৫-১৩৮ হা. ১১৪৪। নবম ও দশম হাদীস রয়েছে “শুয়াবুল ঈমান”, বায়হাকী হা. ৩৫৫৫ ও “আহাদীসুল জামায়ীলী নামক গ্রন্থে হা. ৩৭।)
শায়খ ইবনে তাইমিয়া রাহ. (মৃ. ৭২৮ হি.) বলেন, অর্ধ শাবানের রাতের ফযীলত সম্পর্কে বেশ কিছু মারফু’ হাদীস ও আছার বর্ণিত হয়েছে। যার দাবী হচ্ছে, এটা একটি ফযীলতপূর্ণ রাত। পূর্ববর্তীদের কেউ কেউ এ রাতে নামায আদায় করতেন। অতঃপর তিনি যারা ‘উক্ত হাদীসসমূহকে গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ রাত ও অন্য রাতের মাঝে কোন ফরক নেই বলেছেন’ এর খণ্ডন করে বলেন অনেক আলেম, বরং অধিকাংশই এ রাত ফযীলতপূর্ণ হওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। কারণ এ রাত সম্পর্কীয় হাদীসসমূহ একাধিক সূত্রে বিভিন্ন হাদীসগ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে। (ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকীম পৃ. ২৫৮)
অন্যত্র বলেন
وأما ليلة النصف فقد روي في فضلها أحاديث وآثار، ونقل عن طائفة من السلف أنهم كانوا يصلون فيها، فصلاة الرجل فيها وحده قد تقدمه فيه سلف، وله فيه حجة فلا ينكر مثل هذا.
অর্ধ শাবানের রাতের ফযীলত সম্পর্কে বেশ কিছু মারফু হাদীস ও আছার বর্ণিত হয়েছে। এবং পূর্ববর্তীদের এক জামাআত এ রাতে সালাত আদায় করতেন। তাই শবে বরাতে কেউ যদি একাকী নামায আদায় করে তাতে দোষের কিছু নেই। কারণ এ ক্ষেত্রে দলীল রয়েছে। কাজেই এমন বিষয়কে অস্বীকার করা যাবে না। (মাজমূউল ফাতাওয়া ২৩/৮১)
আহলে হাদীস আলেমদ্বয় মাওলানা আব্দুর রহমান ও উবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী উভয়ে বলেন, শবে বরাত সম্পর্কীয় হাদীসসমূহ সমষ্ঠিগতভাবে ঐ ব্যক্তির বিরুদ্ধে দলীল, যে মনে করে শরীয়তে শবে বরাতের কোন ভিত্তি নেই। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৩/৪৪২ ও মিরআতুল মাফাতীহ ৪/৩২৫)
প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস মরহুম শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী (মৃ. ১৪২০ হি.) "সিলসিলায়ে সহীহা” গ্রন্থে কিছু পূর্বে আলোচিত প্রথম আটজন সাহাবীর বর্ণনাসমূহের সূত্রগুলো নিয়ে পর্যালোচনা শেষে তার সার নির্যাস পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরেছেন এভাবে-
وجملة القول: أن الحديث بمجموع هذه الطرق صحيح بلا ريب، والصحة تثبت بأقل منها عددا ما دامت سالمة من الضعف الشديد، كما هو الشأن في هذا الحديث.
সারকথা হলো, শবে বরাত সম্পর্কীয় হাদীসসমূহ সূত্রগুলোর সমন্বয়ে নিঃসন্দেহে সহীহ। বরং হাদীস সহীহ হওয়াটা এর চেয়ে কম সংখ্যক সূত্রের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, যদি সূত্রগুলো কঠিন দুর্বলতা থেকে মুক্ত হয়। যেমনটি এই হাদীসের ক্ষেত্রে ঘটেছে। (সিলসিলায়ে সহীহা ৩/১৩৮)
শবে বরাত অস্বীকারকারীদের শায়খ আলবানীর বড় ভক্ত মনে হয়। তাদেরকে মরহুম আলবানীর বক্তব্যেটি নিয়ে গবেষণা করার আহবান জানাচ্ছি। আর বিদআতিদের বাড়াবাড়ির প্রতিকার কোন বাস্তব সত্যকে অস্বীকার করে নয়, বরং সত্য বিষয়টি যথাযথ উপস্থাপনার মাধ্যমেই হয়ে থাকে।