ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই রাজনৈতিক অঙ্গনে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও তর্কযুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রধান রাজনৈতিক জোটগুলোর শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে ক্রমেই উত্তেজনা বাড়ছে, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তৃতীয় কোনো পক্ষ অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন রাজনীতিক বিশ্লেষকরা।
নির্বাচনের শুরু থেকেই প্রার্থী ও দলীয় নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তুলছেন। রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, এই উত্তাপ আরও বাড়বে। যদিও প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতিতে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যকে স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়, তবে সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করলে তা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে মত বিশ্লেষকদের।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে সমালোচনা থাকা স্বাভাবিক, তবে অন্যের মত প্রকাশের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়াটাই রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূল। তিনি মনে করেন, এই জায়গাতেই বর্তমানে উদ্বেগের সৃষ্টি হচ্ছে।
১২ ফেব্রুয়ারির ভোটকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। এই নির্বাচনে মূলত দুটি বড় জোট সক্রিয় রয়েছে। একটি বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট, যেখানে গণঅধিকার পরিষদসহ যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলো রয়েছে। অপরটি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট, যেখানে এনসিপিসহ মোট ১০টি দল অংশ নিয়েছে।
প্রচার শুরুর প্রথম দিন সিলেট থেকে বিএনপির নির্বাচনি কার্যক্রম উদ্বোধন করেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ওই জনসভায় তিনি নির্বাচনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বী একটি দলকে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে, রাজধানীর মিরপুরে এক জনসমাবেশের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর প্রচার শুরু হয়। সেখানে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বিএনপির ঘোষিত ‘ফ্যামেলি কার্ড’ কর্মসূচির সমালোচনা করেন। একই সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও বিএনপির বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন এবং পরবর্তী দিনগুলোতেও একই ধরনের অভিযোগ পুনরাবৃত্তি করেন।
প্রচার শুরুর পর থেকেই মাঠপর্যায়ের প্রার্থী ও নেতাদের মধ্যেও তর্কযুদ্ধ চলছে। ঢাকায় আসন বণ্টন নিয়ে এক পক্ষের মন্তব্যের জবাবে অপর পক্ষের প্রার্থী কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান, যা রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও উসকে দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, পরিস্থিতি আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি মানে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে না দেখার মানসিকতা। একক আধিপত্যের দাবি বা অন্যদের গুরুত্বহীন করে দেখার প্রবণতা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা একে অপরকে ঘায়েল করতে গিয়ে যদি পরিস্থিতির অবনতি ঘটান, তাহলে তৃতীয় পক্ষ সেই সুযোগ নিতে পারে। তাই নির্বাচনি মাঠে দায়িত্বশীল আচরণ ও সংযত বক্তব্য নিশ্চিত করা সব পক্ষের জন্যই জরুরি বলে মনে করেন তিনি।