আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে তুরস্কের সাম্প্রতিক উত্থান এবং সিরিয়া কেন্দ্রিক সাফল্যকে ‘নজিরবিহীন’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। গত এক দশকে সিরিয়া ও বৃহত্তর লেভান্ট অঞ্চলে আঙ্কারা যেভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে নিজেদের প্রভাব সুসংহত করেছে, তা সমকালীন ইতিহাসে বিরল। বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৮ সালের চরম নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকে বেরিয়ে এসে তুরস্ক আজ ওই অঞ্চলে কেবল নিজের সীমান্তই রক্ষা করেনি, বরং একটি দেশের অভ্যন্তরীণ শাসন কাঠামোর প্রধান নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের কুর্দি প্রকল্পের ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তুরস্কের এই অবস্থান অর্জনকে বিশেষজ্ঞরা এক অসাধারণ সামরিক ও কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছেন।
২০১৮ সালের প্রেক্ষাপটে তুরস্কের দক্ষিণ সীমান্ত কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। একদিকে রাশিয়া ও ইরান সমর্থিত আসাদ সরকারের প্রবল চাপ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সামরিক সহায়তায় শক্তিশালী হয়ে ওঠা কুর্দি গোষ্ঠী পিকেকে/ওয়াইপিজি (PKK/YPG)। এমন জটিল সমীকরণে যে কোনো শক্তি কৌশলগতভাবে পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও আঙ্কারা তার নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা ও সামরিক সক্ষমতা দিয়ে পরিস্থিতি উল্টে দেয়। কূটনীতি ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের সমন্বয়ে তারা একদিকে রাশিয়া-ইরানকে সীমিত রাখতে সক্ষম হয়, অন্যদিকে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে কুর্দি প্রকল্পকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল করে ফেলে। তুরস্কের এই কৌশলী চালই লেভান্ট অঞ্চলে তাদের অপরিহার্য শক্তিতে রূপান্তর করেছে।
এই সাফল্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো সিরিয়ার ভেতরে একটি কার্যকর শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা। এক সময়কার বিচ্ছিন্ন বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে তুরস্ক একটি সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেছে, যা এখন দেশটির কেন্দ্রীয় শাসন কাঠামোতে বড় ভূমিকা রাখছে। কোনো সরাসরি দখলদারি বা সাম্রাজ্যবাদী শাসন ছাড়াই স্থানীয় শক্তিকে ব্যবহার করে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এই মডেলটি আধুনিক রাজনীতিতে একটি বিরল উদাহরণ। বর্তমানে সিরিয়া তুরস্কের জন্য আর কোনো হুমকি নয়, বরং একটি শক্তিশালী ‘নিরাপত্তা বাফার’ ও প্রভাবক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ও স্থানীয় নেতৃত্বের ক্ষমতায়নই তুরস্ককে আজ লেভান্টে একচ্ছত্র আধিপত্য এনে দিয়েছে।