ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায় তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত তিনটি দ্বীপচরে বসবাসকারী অন্তত ২০ হাজার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। হাসপাতাল, স্থায়ী চিকিৎসক কিংবা জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার অভাবে অসুস্থ হলে অনেক সময় চিকিৎসা পাওয়ার আগেই প্রাণ হারাচ্ছেন রোগীরা—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
তেঁতুলিয়া নদীর বুকে জেগে ওঠা চর মোতাহার, চর নিউলিন ও সিকদারের চর—এই তিনটি চরে নেই কোনো সরকারি বা বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। চিকিৎসার একমাত্র ভরসা কয়েকটি ফার্মেসি ও অনভিজ্ঞ চিকিৎসক। ফলে সাধারণ রোগেও মানুষ ঝাড়ফুঁক বা লোকজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রায় ৬ হাজার ৪৩৭ একর আয়তনের এই দ্বীপচরগুলো সম্পূর্ণভাবে নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম খেয়া নৌকা। চরের অধিকাংশ মানুষ জেলে ও কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত হলেও ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্য খাতের অবহেলায় এখানকার জীবনযাত্রা দিন দিন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
জরুরি রোগীর ক্ষেত্রে চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়াই একমাত্র উপায়। তবে নদীপথে খেয়া পার হতে হয় বলে প্রতিকূল আবহাওয়া, তীব্র স্রোত কিংবা নৌযানের স্বল্পতায় অনেক সময় রোগী পরিবহন সম্ভব হয় না। বিশেষ করে রাতের বেলায় গুরুতর অসুস্থ রোগী নিয়ে নদী পার হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য নেই কোনো নৌ-অ্যাম্বুলেন্স।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্করা। গর্ভকালীন পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব কিংবা নবজাতকের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অনেক নারী ঝুঁকি নিয়ে বাড়িতেই সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হচ্ছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এতে মা ও নবজাতকের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া, জ্বর ও অপুষ্টির হারও বাড়ছে।
চরের বাসিন্দা ফজল মাঝি বলেন, প্রায় চার দশক ধরে বসবাস করলেও এখনো এখানে কোনো স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন হয়নি। গুরুতর অসুস্থ হলে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যায় না, ফলে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হয়। একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বিবি কুলসুম বলেন, গভীর রাতে প্রসব বেদনা উঠলেও নদী পার হতে না পারায় ঝুঁকি নিয়ে ঘরেই সন্তান জন্ম দিতে হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, বারবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মনির হাওলাদার বলেন, চরে একজন স্থায়ী চিকিৎসক নিয়োগ, নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ এবং জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালু করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি একটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন জরুরি।
এ বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শোভন বসাক বলেন, দ্বীপচরের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে বলে তিনি জানান।