ক্যারিবীয় সাগরে সন্দেহভাজন একটি মাদক পাচারকারী নৌযানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবারের এ ঘটনা ট্রাম্প প্রশাসনের নেতৃত্বে ক্যারিবীয় অঞ্চলে চলমান মাদকবিরোধী সামরিক অভিযানের সর্বশেষ কিস্তি, যেখানে সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৮০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্যারিবীয় সাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমা দিয়ে পূর্বাঞ্চলীয় একটি কথিত ‘নারকো-ট্রাফিকিং’ রুট ধরে নৌকাটি চলাচল করছিল এবং সেখানে অবৈধ মাদক বহন করা হচ্ছিল। সামরিক বাহিনীর দাবি, নৌযানটি একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সেটিকে ধ্বংস করার লক্ষ্যেই হামলা চালানো হয়।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমোদনে ক্যারিবীয় ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌযানে অন্তত ২০টির বেশি সামরিক হামলা হয়েছে, যাতে মোট নিহতের সংখ্যা ৮০–৮৭ জনের মধ্যে বলে আনুমানিক ধারণা দেওয়া হচ্ছে। এসব হামলাকে প্রশাসন ‘মাদক কার্টেলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ের অংশ’ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
তবে ২ সেপ্টেম্বরের এক হামলায় নৌকাডুবির পর বেঁচে থাকা দুজনকে পরবর্তী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠার পর, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দ্বিদলীয় কমিটিগুলো পুরো অভিযান নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। কংগ্রেসে দেখানো এক ভিডিওতে দেখা যায়, ধ্বংস হওয়া নৌকার ভগ্নাংশ ধরে ভেসে থাকা দুজন ব্যক্তির ওপর থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয় বলে কয়েকজন আইনপ্রণেতা জানিয়েছেন।
হোয়াইট হাউসের বরাতে বলা হয়েছে, ওই দ্বিতীয় হামলার আদেশ দিয়েছিলেন অভিযানের দায়িত্বপ্রাপ্ত নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল ব্র্যাডলি, তবে তিনি কংগ্রেসের বৈঠকে দাবি করেছেন, ‘সবাইকে মেরে ফেলতে হবে’—এমন কোনো নির্দেশ তিনি পাননি এবং কাউকে নির্বিচারে হত্যারও আদেশ দেননি। তবু কংগ্রেসের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট অ্যাডাম স্মিথ বলেছেন, ভিডিওতে যা দেখা গেছে তা যুদ্ধাপরাধের আশঙ্কা তৈরি করছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো শুরু থেকেই এসব হামলাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে তুলে ধরছে। কলম্বিয়ার একজন জেলে আলেহান্দ্রো কাররানসা নিহত হওয়ার অভিযোগে তার পরিবার সম্প্রতি আঞ্চলিক মানবাধিকার সংস্থা ইন্টার-আমেরিকান কমিশন অন হিউম্যান রাইটসে (আইএসিএইচআর) আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের নামে দায় আরোপ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তি দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র মাদক কার্টেল ও তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ‘সশস্ত্র সংঘাতে’ রয়েছে এবং এ কারণে এই গোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের তারা ‘অবৈধ যোদ্ধা’ হিসেবে বিবেচনা করছে। সমালোচকদের ভাষ্য, এ ধরনের আইনি ব্যাখ্যা দেখিয়ে সমুদ্রসীমায় পরিচালিত সামরিক হামলাগুলোকে যুদ্ধের অংশ হিসেবেই বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যদিও এ নিয়ে কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো যুদ্ধ ঘোষণা বা ক্ষমতা অনুমোদন করেনি।
এ হামলাসহ পুরো সামরিক অভিযানকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও বাড়ছে। ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌসামরিক উপস্থিতি জোরদার করা হয়েছে এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন, এই চাপ প্রয়োগের মূল লক্ষ্য তার সরকারকে দুর্বল করে উৎখাত করা।