চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের মাঝপথে সরকার রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। প্রচলিত নিয়মে যেখানে মাঝামাঝি সময়ে লক্ষ্য কমানো হয়, সেখানে বিদ্যমান ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব টার্গেট ৫৫ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে নতুন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা—যা আগের টার্গেটের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় এ বছর প্রায় ৪৯ শতাংশ বাড়তি সংগ্রহ করতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, ঘাটতি কমানো ও ব্যয় সামাল দিতে আয় বৃদ্ধির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই নতুন টার্গেট নির্ধারণ করে তা এনবিআরের কাছে পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনা পাওয়ার পর এনবিআর তাদের অধীনস্থ সব অফিসকে বাড়তি সংগ্রহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, অর্থনীতি চাপের মুখে থাকায় লক্ষ্য অর্জন কঠিন হলেও রাজস্ব বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
নতুন টার্গেটকে চ্যালেঞ্জিং আখ্যা দিয়ে এনবিআরের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে দুরবস্থা বজায় থাকলেও রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হবে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই–অক্টোবর) রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশের কিছু কম, আর লক্ষ্যমাত্রার ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭,২১৯ কোটি টাকা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় প্রায় ৪৯ শতাংশ বাড়তি আদায়ের লক্ষ্য বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ বহু বছর ধরেই লক্ষ্যমাত্রার নিচে রয়েছে, তার ওপর নির্বাচন–কেন্দ্রিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনীতির স্থবির পরিস্থিতি টার্গেট অর্জনকে আরও কঠিন করে তুলবে। বড় টার্গেট দিয়ে পরে তা পূরণ করতে না পারলে বাজেট নিয়ে আস্থাহীনতা তৈরি হয়; অতীতেও এমন হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, এই নতুন টার্গেট আইএমএফ–সংশ্লিষ্ট কোনো শর্তের কারণে কিনা, সেটিও পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
রাজস্ব আদায়ের ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত আড়াই দশকে মাত্র একবার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা মূল টার্গেটের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭–০৮ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি হয়েছিল, যা এখনো সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত। সাধারণত অন্য বছরগুলোতে সংশোধিত লক্ষ্য মূল টার্গেটের সমান বা কম রাখা হয়। গত পাঁচ বছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধির গড় হার ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ।
২০০৭–০৮ সালে এনবিআরের চেয়ারম্যান ছিলেন ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ। তার মতে, দেশের অর্থনীতির প্রকৃত আকার অনুযায়ী রাজস্ব আদায় তুলনামূলকভাবে কম, ফলে আদায় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, জিডিপির সঙ্গে করের অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম হওয়া উদ্বেগজনক। যাদের কর দেওয়ার কথা, তাদের কাছ থেকে সঠিকভাবে কর আদায় করা গেলে বাড়তি লক্ষ্য বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড