আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওনে কালো জাদু ও কুসংস্কারভিত্তিক বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে চলমান মানববলির ঘটনা আবারও আলোচনায় এসেছে। মানবদেহের অঙ্গ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত এই নৃশংসতার চিত্র উঠে এসেছে বিবিসি আফ্রিকা আইয়ের এক অনুসন্ধানে, যেখানে দেখা গেছে—এসব হত্যাকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতার মধ্যেই ঘটছে।
চার বছর আগে ১১ বছরের শিশু পাপায়োকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাঁর মা সাল্লাই কালোকা অভিযোগ করেন, ছেলেকে হারানোর পরও কোনও ন্যায়বিচার পাননি। দুই সপ্তাহ নিখোঁজ থাকার পর পাপায়োর ক্ষতবিক্ষত দেহ একটি পরিত্যক্ত কূয়া থেকে উদ্ধার করা হয়, যেখানে তার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়া হয়েছিল। স্থানীয়দের দাবি—মাকেনি অঞ্চলে এ ধরনের ঘটনা বিরল নয় এবং পুলিশ অনেক সময় এগুলোকে ‘রিচুয়াল কিলিং’ হিসেবেও স্বীকৃতি দেয় না।
বিবিসির অনুসন্ধানী দল এমন একাধিক ব্যক্তির সন্ধান পেয়েছে যারা নিজেদের জুজু অনুশীলনকারী পরিচয় দিয়ে মানব অঙ্গ সরবরাহের প্রস্তাব দেয়। গিনি সীমান্তবর্তী কাম্বিয়া জেলায় এক জুজু অনুশীলনকারী দাবি করেন, পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। তিনি একটি শুকনো মানব খুলিও দেখান, যার জন্য কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত দাবি করা হয়।
দেশটিতে মাত্র একজন প্যাথলজিস্ট থাকায় এসব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের মধ্যেও কালো জাদু নিয়ে ভয়–ভীতি কাজ করে, যা অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে আরও দুরূহ করে তোলে। অনেক জুজু অনুশীলনকারী নিজেদের হার্বালিস্ট পরিচয় দেয়, ফলে প্রকৃত চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ওয়াটারলু এলাকায় আরও এক সন্দেহভাজন অঙ্গ সরবরাহকারীকে অনুসন্ধান দল শনাক্ত করে। তাঁর দাবি, ২৫০ জনেরও বেশি ওঝা–গুনিন তাঁর অধীনে কাজ করে এবং প্রয়োজন হলে যে কোনো দেহাংশ সংগ্রহ করতে পারে। পরে পুলিশ অভিযানে গিয়ে মানব হাড়, চুলসহ বিভিন্ন দেহাংশ উদ্ধার করে। এর আগেও একই এলাকায় এক শিক্ষকের লাশ একটি মন্দির থেকে উদ্ধার হয়েছিল, তবে মামলাটিও আটকে যায় আদালতে।
বিবিসির প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময়ই মাকেনি শহরে ২৮ বছর বয়সী নারী ফাতমাটা কন্তে নিহত হন। ঘটনাস্থলের চিহ্ন দেখে স্থানীয়দের ধারণা—এটিও কালো জাদু–সংক্রান্ত হত্যা। পরিবারের খরচে করা ময়নাতদন্ত থেকেও কোনও স্পষ্ট তথ্য মেলেনি।
এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ও তদন্তের অগ্রগতি না থাকায় বহু পরিবার আজও বিচারহীনতার বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, পুলিশের উদাসীনতা, ভয়ের সংস্কৃতি এবং দেহাংশ বাণিজ্যের গোপন নেটওয়ার্ক পুরো অঞ্চলজুড়ে এক গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে।