আপিল বিভাগের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল: আগাম নির্বাচন নয়, ১৪ বছরের পুরোনো রায় সম্পূর্ণ বাতিল

আপলোড সময় : ২০-১১-২০২৫ ১০:৫৪:১৬ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২০-১১-২০২৫ ১০:৫৪:১৬ অপরাহ্ন

১৪ বছর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়া যে রায়টি বহাল ছিল, আপিল বিভাগ সেটি পুরোপুরি বাতিল করেছে। এর ফলে সংবিধানে থাকা ত্রয়োদশ সংশোধনীর বৈধতা ফিরে এসেছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্বহাল হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) রিভিউ আবেদনের নিষ্পত্তির মাধ্যমে দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই রায় ঘোষণা করে। তবে এই ব্যবস্থাটি আসন্ন ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নয়, পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে কার্যকর হবে।

আইনজীবীরা জানিয়েছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে আগাম নির্বাচন। আপিল শুনানিতে বিএনপি-সহ আপিলকারীরা নিজেরাই মত দেন—বর্তমান সরকারের অধীনেই পরবর্তী নির্বাচন হওয়া উচিত, কারণ আইন বা আদালতের রায় সাধারণত ভবিষ্যতকাল থেকে কার্যকর হয়। এই অবস্থানই আদালতের রায়ের পর পরিষ্কারভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যাত্রা শুরু হয় নব্বইয়ের পরবর্তী উত্তাল সময়ে। এরশাদ সরকারের পতনের পর প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত অনানুষ্ঠানিক তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা দেশের মানুষের কাছে নতুন একটি মডেল তুলে ধরে। এরপর ১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার পটভূমিতে বিরোধী দলগুলোর দাবির মুখে ১৯৯৬ সালে সংবিধানে যোগ হয় ত্রয়োদশ সংশোধনী। এই ব্যবস্থার অধীনে ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবস্থাকে ঘিরে বিতর্কও বাড়তে থাকে—বিশেষ করে উপদেষ্টা নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে। ২০০৬–০৭ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ‘এক-এগারো’ পর্ব এবং দু’বছরের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কাল এই ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। পরে ২০১০ সালে আপিল বিভাগের রায়ে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী ঘোষণা করা হয়, যা ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে কার্যকর হয়।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই রায়ের বিরুদ্ধেই একাধিক রিভিউ আবেদন পড়ে আপিল বিভাগে, যার ফলাফলে এখন ফেরত এলো পুরোনো কাঠামো। তবে এই পুনর্বহাল ব্যবস্থা ভবিষ্যত নির্বাচনে কীভাবে প্রয়োগ হবে—তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে জুলাই সনদ নিয়ে আগাম গণভোটের ওপর। সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের জন্য একটি দীর্ঘ, বহুস্তরীয় বাছাই প্রক্রিয়া প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ বললে বর্তমান কাঠামো উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হতে পারে।

ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান উপদেষ্টাসহ ১০ জনের বেশি হবে না এবং প্রধান উপদেষ্টা সাধারণত সর্বশেষ অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি হবেন। বিকল্প প্রক্রিয়া অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মধ্যে থেকে বাছাই সম্ভব না হলে রাষ্ট্রপতিই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে নিয়োগ দেবেন।

কিন্তু জুলাই সনদের প্রস্তাবিত নতুন কাঠামোতে প্রধান উপদেষ্টা বাছাই হবে স্পিকারের নেতৃত্বে একটি পাঁচ সদস্যের কমিটির মাধ্যমে, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো মনোনয়ন দেবে এবং প্রয়োজন হলে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিরাও প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবেন। ক্রমভিত্তিক ভোটিং পদ্ধতিতে চূড়ান্ত নির্বাচন হবে এবং ৯০ দিনের জন্য এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে।

একাধিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সাংবিধানিক প্রয়াস এবং দীর্ঘদিনের বিতর্ক অতিক্রম করে আপিল বিভাগের রায়ে যে ব্যবস্থা ফেরত এসেছে—তা আগামী নির্বাচনী চক্রে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর বাস্তব রূপ কেমন হবে, তা নির্ভর করছে গণভোটসহ পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর ওপর।

সম্পাদকীয় :

লাইসেন্স নং: TRAD/DNCC/013106/2024 বার্তা বিভাগ: [email protected] অফিস: [email protected]

অফিস :

যোগাযোগ: মিরপুর, শেওড়াপাড়া হটলাইন: 09638001009 চাকুরী: [email protected]