ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ওয়াশিংটন। পরিত্যক্ত নৌঘাঁটি পুনর্গঠন থেকে শুরু করে যুদ্ধজাহাজ, ড্রোন ও বোমারু বিমান মোতায়েন—সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে কেন্দ্র করে এক দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পরিকল্পনার দিকে এগোচ্ছে।
পুয়ের্তো রিকোর রুজভেল্ট রোডস নামের পুরনো নৌঘাঁটিতে দুই দশক পর আবার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, রানওয়ের সংলগ্ন ট্যাক্সিওয়েগুলো নতুনভাবে পাকা করা হচ্ছে, যা যুদ্ধবিমান ও মালবাহী বিমান চলাচলের উপযোগী করা হচ্ছে। ২০০৪ সালে পরিত্যক্ত হওয়ার আগে এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ ঘাঁটি। এর কৌশলগত অবস্থান এবং বিস্তীর্ণ এলাকা বড় আকারের সামরিক অভিযানের জন্য আদর্শ বলে জানান এক মার্কিন কর্মকর্তা।
শুধু রুজভেল্ট রোডস নয়, পুয়ের্তো রিকোর রাফায়েল হার্নান্দেজ বিমানবন্দর এবং সেন্ট ক্রয়ের হেনরি ই. রোহলসেন বিমানবন্দরেও একই ধরনের সম্প্রসারণ চলছে—যেখানে নতুন রাডার, মোবাইল কন্ট্রোল টাওয়ার ও গোলাবারুদ সংরক্ষণাগার স্থাপন করা হয়েছে। দুটি দ্বীপই ভেনেজুয়েলা থেকে প্রায় ৫০০ মাইল দূরে, যা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।
রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, তিনজন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা এবং তিনজন সমুদ্র বিশেষজ্ঞ নিশ্চিত করেছেন—এই সব কাজ যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভেনেজুয়েলা অভিযানেরই প্রস্তুতি। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো বরাবরই অভিযোগ করে আসছেন, ওয়াশিংটন তার সরকার পতনের ষড়যন্ত্র করছে।
ওয়াশিংটনের থিংকট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS)-এর সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টোফার হার্নান্দেজ-রয়ের ভাষায়, “এই উদ্যোগ সরাসরি মাদুরো প্রশাসনের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি এবং সামরিক মহলে বিভাজন তৈরির কৌশল।”
রয়টার্সের বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও নৌতৎপরতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। স্যাটেলাইট ছবি, ফ্লাইট ট্র্যাকিং ও সমুদ্রপথ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়—যুদ্ধজাহাজ, পারমাণবিক সাবমেরিন, নজরদারি বিমান ও আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী ক্যারিবিয়ান এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। এটি ১৯৯৪ সালের হাইতি অভিযানের পর অঞ্চলে সবচেয়ে বড় সামরিক প্রস্তুতি।
এই বছরের সেপ্টেম্বর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ১৪টি অভিযানে অংশ নিয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগ ছিল মাদকবিরোধী অপারেশন। এসব অভিযানে ৬১ জন নিহত হয়েছে এবং ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা তীব্র হয়েছে।
হোয়াইট হাউস জানায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের মাদকচক্র দমনে জোর দিয়েছেন। মুখপাত্র আনা কেলির ভাষায়, “প্রেসিডেন্ট মাদক-সন্ত্রাস দমন করে আমেরিকান নাগরিকদের নিরাপত্তায় নজিরবিহীন ভূমিকা রেখেছেন।”
অগাস্ট থেকে যুদ্ধজাহাজ USS Gerald Ford, পারমাণবিক সাবমেরিন এবং বিভিন্ন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে। রুজভেল্ট রোডস ঘাঁটির ট্যাক্সিওয়ে আধুনিকায়নের পাশাপাশি অন্তত ২০টি নতুন তাঁবু ও একাধিক হেলিকপ্টার সেখানে দেখা গেছে।
সিএসআইএস উপদেষ্টা মার্ক ক্যানসিয়ানের মতে, “এ ধরনের অবকাঠামো সংস্কার যুক্তরাষ্ট্রের বিমান চলাচল ও অভিযানের সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।”
এদিকে সেন্ট ক্রয়েতে নতুন রাডার ও পার্কিং স্পেস বাড়ানোর কাজ চলছে। স্থানীয় গভর্নর জানিয়েছেন, সৈন্য মোতায়েন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সমন্বয় আছে, তবে পূর্ণ পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত নন।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, অন্তত এক ডজন Poseidon P-8A গুপ্তচর বিমান নিয়মিতভাবে ক্যারিবিয়ান ও বাহামার আকাশে টহল দিচ্ছে। অক্টোবর মাসে B-1B Lancer ও B-52 Stratofortress বোমারু বিমান ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছাকাছি উড্ডয়ন করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই তৎপরতা শুধু মাদকবিরোধী নয়; বরং ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক বিকল্প প্রস্তুতির ইঙ্গিত বহন করছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই সম্প্রতি বলেছেন, “এবার স্থলভাগে নামার পালা।”
সূত্র: রয়টার্স