
বর্তমান সমাজে মানুষের আচরণে লৌকিকতা ও কৃত্রিমতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সীমাহীন ভণিতা, আনুষ্ঠানিকতা ও বাহ্যিক চাকচিক্যের কারণে সত্য ও বাস্তবতা যেন হারিয়ে যাচ্ছে। নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধও কৃত্রিম হয়ে উঠছে। অথচ ইসলামের শিক্ষা অকৃত্রিমতা, সরলতা ও বিনয়ের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
আল্লাহ তাআলা কোরআনে ঘোষণা করেছেন—“বলুন, আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না, আর আমি কৃত্রিমতার অন্তর্ভুক্ত নই।” (সুরা সাদ, আয়াত: ৮৬)। অর্থাৎ, ইসলামে কৃত্রিমতার কোনো স্থান নেই।
কৃত্রিমতা পরিহারে নবীজির নির্দেশনা
সহিহ হাদিসে এসেছে, সাহাবি আনাস (রা.) বর্ণনা করেন—উমর (রা.) বলেছিলেন, আমাদের কৃত্রিম আচরণ ও লৌকিকতা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। (বুখারি, হাদিস: ৭২৯৩)। আবার আসমা বিনতে ইয়াজিদ (রা.) বর্ণনা করেন, একবার নবীজি (সা.) খাবারে আমন্ত্রণ জানালে তারা লৌকিকতার কারণে না বলেছিলেন। তখন তিনি বলেন, “তোমরা (লৌকিকতার বশবর্তী হয়ে) ক্ষুধা ও মিথ্যাকে একত্র করো না।” (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩২৯৮)। এতে বোঝা যায়, নবীজি (সা.) সরল ও অকৃত্রিম জীবনযাপনের শিক্ষা দিয়েছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অকৃত্রিম আচরণের দৃষ্টান্ত
নবীজি (সা.) সর্বদা সাধারণ মানুষের নাগালে ছিলেন। আনাস (রা.) বলেন, মদিনার নিম্নবর্গের কোনো নারীও তাঁর হাত ধরে প্রয়োজনীয় স্থানে নিয়ে যেতে পারতেন। (বুখারি, হাদিস: ৬০৭২)। আবার সহচরদের সঙ্গে দুনিয়া বা আখিরাতের আলোচনায় তিনি স্বাভাবিকভাবে অংশগ্রহণ করতেন, নবুয়তের গাম্ভীর্য এতে ক্ষুণ্ন হয় না। (আলমুজামুল কাবির, হাদিস: ৪৮৮২)।
আয়েশা (রা.)-এর ভাষ্যে, নবীজি (সা.) ঘরে পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন এবং আজান হলে নামাজের জন্য বের হয়ে যেতেন। (বুখারি, হাদিস: ৫৩৬৩)। এমনকি হিজরতের সময় মদিনায় প্রবেশকালে তাঁর সাদামাটা আচরণের কারণে অনেকে তাঁকে চিনতে পারেননি, বরং আবু বকর (রা.)-কে সালাম করেছিলেন। (বুখারি, হাদিস: ৩৯০৬)।
এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, তিনি সর্বদা অকৃত্রিম ছিলেন—চাই পরিবারে, সমাজে কিংবা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে।
শিক্ষা
আজকের সমাজে লৌকিকতা ও কৃত্রিমতা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করছে। অথচ নবীজি (সা.) তাঁর আদর্শ জীবনাচরণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, সত্যিকার সম্মান ও মর্যাদা নিহিত রয়েছে সরলতা, বিনয় ও অকৃত্রিমতায়। আমাদের দৈনন্দিন আচরণে এই আদর্শই হওয়া উচিত পথপ্রদর্শক।